মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএসের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনকে আরও নিরাপদ করতে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠালে লেনদেনটি কে করেছেন, কাকে পাঠিয়েছেন, কোথা থেকে পাঠিয়েছেন এবং লেনদেনের ধরন স্বাভাবিক কি না—এসব তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হবে।
প্রতারণা, ভুয়া সিম, অবৈধ এমএফএস হিসাব, অর্থ পাচার ও ডিজিটাল আর্থিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত পর্যবেক্ষণ কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, মেশিন লার্নিং এবং রিয়েল-টাইম লোকেশন প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করতে রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে ভুয়া সিম ও অবৈধ এমএফএস হিসাব শনাক্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাতিল করতে আলাদা কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার বা এনটিএমসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এআই ও মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের লেনদেনের ধরন বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক কার্যক্রম, প্রতারণার সম্ভাব্য প্যাটার্ন এবং অর্থ পাচারের ঝুঁকি শনাক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক, এনটিএমসি এবং এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে। এতে সন্দেহজনক কোনো লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং লেনদেনের অবস্থান দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ডিজিটাল লেনদেনের সময় গ্রাহকের অবস্থান শনাক্তের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। রিয়েল-টাইম লোকেশন তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে, লেনদেনের সময় সংশ্লিষ্ট এমএফএস অ্যাপ চালু করলে জিওলোকেশন চালু থাকা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এর ফলে সন্দেহজনক লেনদেনের ক্ষেত্রে শুধু হিসাবধারী নয়, লেনদেনের সম্ভাব্য অবস্থানও যাচাই করা যাবে।
এমএফএস এজেন্টদের কার্যক্রমেও আসছে প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ। নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে এজেন্টদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখতে ভার্চুয়াল ডিজিটাল সীমানা বা জিওফেন্সিং ধরনের ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এর ফলে কোনো এজেন্ট নির্ধারিত এলাকার বাইরে গিয়ে তাঁর এজেন্ট আইডি ব্যবহার করে লেনদেন পরিচালনা করলে সেটি শনাক্ত করা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে এক এলাকার এজেন্ট পরিচয় ব্যবহার করে অন্য এলাকায় অননুমোদিত বা অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ কমবে।
এমএফএস হিসাব খোলার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র ও বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কেন্দ্রীয় বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচয় যাচাইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
শুধু নতুন গ্রাহক নয়, আগে খোলা এমএফএস হিসাবও পর্যায়ক্রমে যাচাইয়ের আওতায় আনা হবে। গ্রাহকের এনআইডি এবং নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরের তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে। ভুয়া পরিচয় বা অবৈধ ব্যবহারকারী শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট হিসাবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এ ছাড়া এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহক, এজেন্ট ও রিটেইলারদের শতভাগ ই-কেওয়াইসি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সিম নিবন্ধন ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর নামে নিবন্ধিত মোবাইল সিম ছয় মাসের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ জন্য বায়োমেট্রিক যাচাই ব্যবস্থাকে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সরকারি তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে মৃত ব্যক্তির পরিচয়ে দীর্ঘদিন সিম সক্রিয় রাখার সুযোগ কমবে।
একটি এনআইডির বিপরীতে সব মোবাইল অপারেটর মিলিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি সিম রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। দুইটির বেশি সিম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালুর কথা ভাবা হচ্ছে। সিম নিবন্ধনের সময় আঙুলের ছাপ ও মুখমণ্ডলের ছবিও কেন্দ্রীয়ভাবে যাচাইয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, এমএফএস ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে অপরাধ, অর্থ পাচার ও মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড ঠেকাতে সরকার সমন্বিত উদ্যোগ নিচ্ছে। নতুন ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অপব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতারণা, অবৈধ অর্থ লেনদেন ও অন্যান্য অপরাধের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালু হলে একদিকে যেমন বৈধ গ্রাহকদের লেনদেন আরও নিরাপদ হতে পারে, অন্যদিকে সন্দেহজনক আর্থিক কর্মকাণ্ড দ্রুত শনাক্ত করার সক্ষমতাও বাড়বে।
সরকারের পরিকল্পিত এই সমন্বিত ব্যবস্থায় পরিচয় যাচাই, লেনদেন পর্যবেক্ষণ, অবস্থান শনাক্তকরণ এবং সিম ব্যবস্থাপনা—চারটি বিষয়কে একসঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নিরাপত্তা ও জবাবদিহি আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
