১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণআন্দোলনকে একই দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তার ভাষ্য, দুটি ঘটনাই দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হলেও উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রোববার (২৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, আর জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন। তাই দুটি ঐতিহাসিক অধ্যায়কে এক কাতারে বিবেচনা না করে, তাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
নিজেকে একজন শহীদ পরিবারের সন্তান হিসেবে পরিচয় দিয়ে মন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার জন্য অসংখ্য মানুষ জীবন দিয়েছেন এবং অসংখ্য নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু আজও অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা পূর্ণাঙ্গ তালিকা সম্পন্ন হয়নি। অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের তালিকা তৈরির উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন।
তবে তিনি বলেন, শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের স্বীকৃতি দিলেই চলবে না। বিগত প্রায় ১৭ বছর ধরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যারা নিহত, আহত কিংবা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদেরও রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংসদে বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি একটি শোকাহত মায়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, আন্দোলনে প্রাণ দেওয়া কিংবা আহত হওয়া অনেক পরিবারের সদস্য আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের অবদান উপেক্ষিত থাকলে সেটি বৈষম্যের জন্ম দেবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামাজিক অবক্ষয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ত্রাণমন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই সমাজের উন্নতি নিশ্চিত হয় না। মাদক, জুয়া, ধর্ষণসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে আইনের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও জনসম্পৃক্ত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে।
তার মতে, কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও অনেক অপরাধ কমছে না। তাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে নৈতিক মূল্যবোধ জোরদার হয় এবং অপরাধ প্রবণতা কমে।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে নিজ জেলা লালমনিরহাটে ‘আলোকিত লালমনি’ নামে একটি সামাজিক উদ্যোগ শুরু করার কথাও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ওয়ার্ড থেকে জেলা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে এই কর্মসূচি পরিচালিত হবে। একই ধরনের উদ্যোগ দেশের অন্যান্য এলাকাতেও নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বর্তমান জাতীয় সংসদের কার্যক্রম নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করেন আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও শালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে ইতিহাসের প্রতি সম্মান, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনে শালীন ভাষা ও দায়িত্বশীল আচরণ বজায় রাখারও আহ্বান জানান তিনি।
