দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ৩১ নম্বর কূপে দেশের অন্যতম গভীর অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে। এই প্রকল্প সফল হলে শুধু নতুন গ্যাসের মজুতই আবিষ্কৃত হবে না, বরং ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি গভীর কূপ খননের পথও উন্মুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, তিতাস-৩১ কূপের পাশাপাশি কুমিল্লার বাখরাবাদ, শ্রীকাইল এবং পাবনার মোবারকপুর এলাকায় আরও তিনটি গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চারটি কূপ মিলিয়ে সম্ভাব্য গ্যাসের মজুত প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তিতাস-৩১ কূপে চলছে দেশের অন্যতম গভীর খনন
বর্তমানে তিতাস-৩১ কূপে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীর পর্যন্ত খনন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এটি দেশের স্থলভাগে পরিচালিত সবচেয়ে গভীর অনুসন্ধান প্রকল্পগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই কূপে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত রয়েছে। অনুসন্ধান সফল হলে প্রতিদিন প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
একই রিগ দিয়ে শুরু হবে আরও তিনটি প্রকল্প
তিতাস-৩১ কূপের কাজ শেষ হওয়ার পর ব্যবহৃত ড্রিলিং রিগ কুমিল্লার বাখরাবাদে স্থানান্তর করা হবে। সেখানে প্রায় ৪ হাজার ৩৬০ মিটার গভীর পর্যন্ত খনন পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ কূপ থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
পরবর্তী পর্যায়ে কুমিল্লার শ্রীকাইল এবং পাবনার মোবারকপুরে প্রায় ৬ হাজার মিটার গভীর পর্যন্ত অনুসন্ধান চালানো হবে। এসব প্রকল্প সফল হলে দেশের গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
জ্বালানি নিরাপত্তায় দেশীয় অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও আমদানিনির্ভর জ্বালানির ঝুঁকি কমাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের বিকল্প নেই।
তাদের মতে, নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও তুলনামূলকভাবে কম পড়বে।
গভীর কূপ খননে রয়েছে বড় কারিগরি চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, গভীর স্তরে গ্যাস অনুসন্ধান অত্যন্ত জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর একটি প্রক্রিয়া। বিশেষ করে উচ্চচাপযুক্ত ভূস্তরে খনন পরিচালনা করতে অত্যন্ত দক্ষতা ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়।
বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমেদ ফারুক বলেন, দেশের ভূগর্ভে এমন উচ্চচাপের স্তর রয়েছে যেখানে নিরাপদভাবে খনন করা অত্যন্ত কঠিন। অতীতে দেশের কোনো কূপে সেই স্তর অতিক্রম করে সফলভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি। তাই এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
অর্থায়ন অব্যাহত রাখার আহ্বান
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেনের মতে, বাংলাদেশে আগে এত গভীর পর্যায়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম খুব কম হয়েছে। বর্তমান উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, অনুসন্ধান প্রকল্পগুলো যেন অর্থের সংকট বা প্রশাসনিক জটিলতায় মাঝপথে থেমে না যায়, সে বিষয়েও সরকারকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
নতুন সম্ভাবনার পথে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত
বাংলাদেশে সাধারণত আড়াই হাজার থেকে চার হাজার মিটার গভীর পর্যন্ত কূপ খনন করা হয়ে থাকে। এর আগে দেশের সর্বোচ্চ গভীর কূপ খনন হয়েছিল ফেঞ্চুগঞ্জে, যার গভীরতা ছিল ৪ হাজার ৯৭৭ মিটার।
নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সেই রেকর্ডও অতিক্রম করবে বর্তমান প্রকল্পগুলো। সফল অনুসন্ধানের মাধ্যমে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে আমদানি ব্যয় কমার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
