জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) চতুর্থ রাউন্ডে রাজশাহী বিভাগের বিপক্ষে ইতিহাস গড়লেন ঢাকা বিভাগের দুই ব্যাটার মোহাম্মদ নাঈম শেখ ও মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন। চতুর্থ উইকেটের জুটিতে তারা নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছেন, যা দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি।
রাজশাহী বিভাগীয় স্টেডিয়ামে আয়োজিত এই ম্যাচে দারুণ ব্যাটিং প্রদর্শনী দেখিয়েছেন এই জুটি।
উইকেটের পিছনের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইনিংসের শুরুর দিকে দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়েছিল ঢাকা। দলীয় মাত্র ৮৮ রানের মাথায় সাজঘরে ফিরেছিলেন দলের তিন ব্যাটার। ওই কঠিন পরিস্থিতিতে ৩০ ওভারের একটু বেশি খেলা অবস্থায় ক্রিজে একসঙ্গে জুটি বাঁধেন নাঈম ও অঙ্কন।
এরপর শুরুর সেই ধাক্কা দারুণভাবে সামলে নেন তারা এবং পুরো দিনজুড়ে রাজশাহী বোলারদের কোনো সুযোগ না দিয়ে অবিচ্ছিন্ন থেকে দিন শেষ করেন।
পরের দিন সকালেও নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও মনোযোগ ধরে রাখেন দুই ব্যাটার। রাজশাহীর ফিল্ডার ও বোলারদের কোনো ধরনের সাফল্য পাওয়ার সুযোগ না দিয়ে তারা সচল রাখেন রানের চাকা।
মধ্যাহ্ন বিরতির আগে আরও প্রায় একশ রান যোগ করেন স্কোরবোর্ডে। অঙ্কন তার স্বভাবসুলভ পরিমিত ব্যাটিংয়ে নিজের আগের সব রেকর্ড পেছনে ফেলে ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ শতক তুলে নেন। অন্যদিকে, নাঈম শেখ দুর্দান্ত সব শট খেলে স্পর্শ করেন তার দীর্ঘ অপেক্ষার প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির কাঙ্ক্ষিত স্বাদ। চলতি ঘরোয়া লিগে এটি কোনো ব্যাটারের দ্বিতীয় দ্বিশতক।
লাঞ্চের পর আরও আগ্রাসী ভঙ্গিতে খেলতে শুরু করেন এই জুটি। দ্রুত রান তোলার তাগিদে ওভারপ্রতি রানের গতি বাড়িয়ে দেন তারা। শফিকুলের একটি বাইরের বলকে আলতো টোকায় সীমানার বাইরে পাঠিয়ে এই জুটি ঐতিহাসিক সাড়ে তিনশ রানের কোঠা পার করে।
তবে এর ঠিক পরেই ইনিংসের ইতি ঘটে। এসএম মেহেরব হাসানের একটি ডেলিভারিতে বড় শট খেলতে গিয়ে আকাশে বল ভাসিয়ে দেন অঙ্কন। লং অন থেকে দৌড়ে এসে সহজ ক্যাচ লুফে নেন শফিকুল ইসলাম।
আউট হওয়ার আগে ১৪টি চার ও ৮টি ছক্কার সাহায্যে ২৮৯ বল মোকাবেলা করে ১৬৫ রানের চমৎকার একটি ইনিংস খেলেন মাহিদুল। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এটিই তার ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। তাদের এই রেকর্ডগড়া জুটিটি স্থায়ী হয়েছিল ৫৩৪ বল পর্যন্ত, যেখানে তারা সংগ্রহ করেন অবিস্মরণীয় ৩৬৩ রান।
এর মধ্য দিয়ে দেশীয় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে চতুর্থ উইকেটে আগের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস রচিত হলো। দীর্ঘ এক দশক আগে ২০১৪-১৫ মৌসুমে সিলেটের পক্ষে অলক কাপালি ও রাজিন সালেহ ৩৪৮ রান যোগ করে রেকর্ডটি নিজের করে রেখেছিলেন, যা এতদিন অক্ষুণ্ণ ছিল।
বিশ্ব ক্রিকেটের দীর্ঘ পরিসরের রেকর্ডের কথা বিবেচনা করলে অবশ্য এই জুটি অনেক আগেই থেমেছে। ১৯৪৬ সালের রঞ্জি ট্রফিতে বরোদার হয়ে বিজয় হাজারে ও গুল মোহাম্মদ ৫৭৭ রানের মহাকাব্যিক জুটি গড়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন।
এছাড়া বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও যেকোনো উইকেটে সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ডটি বেশ দূরেই রয়েছে; ২০১২-১৩ সালের বিসিএলে মার্শাল আইয়ুব ও মেহরাব হোসেন জুনিয়র মিলে সেন্ট্রাল জোনের হয়ে ৪৯৪ রানের জুটি গড়েছিলেন।
মাহিদুলের বিদায়ে এই দীর্ঘ ম্যারাথন জুটির সমাপ্তি ঘটলেও ঢাকার ইনিংসের গতি থমকে যায়নি। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ১২৪ ওভার শেষে ঢাকার সংগ্রহ ৪ উইকেটে ৪৭০ রান। এর মাঝে ট্রিপল সেঞ্চুরির সুবাস ছড়াচ্ছেন মোহাম্মদ নাঈম শেখ, যিনি পেশাদার ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস উপহার দিয়ে ২৫৪ রানে অপরাজিত থেকে মাঠের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
সান নিউজ / রাজীব
