রাজধানী ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অদৃশ্য অথচ বিশাল আর্থিক চক্র, যেখানে সাধারণ পরিচ্ছন্নতার সেবাই পরিণত হয়েছে কোটি টাকার ব্যবসায়। প্রতিদিন ভোরে শহরের অলিগলি থেকে ময়লা সংগ্রহ করা হলেও সেই বর্জ্য ঘিরে মাঠপর্যায়ে চলছে নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের অভিযোগ।
শান্তিনগরের কাওসারের মতো অসংখ্য ভ্যানচালক প্রতিদিন অল্প পারিশ্রমিকে কঠোর পরিশ্রম করে শহরের বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্ধারিত ডাম্পিং স্থানে পৌঁছে দেন। কিন্তু তাদের এই পরিশ্রমের আড়ালে তৈরি হয়েছে বহুস্তরীয় একটি অর্থনৈতিক কাঠামো, যেখানে হাতবদলের মাধ্যমে বাড়ছে টাকার অঙ্ক।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন পল্টন, মতিঝিল, ধানমন্ডিসহ মোট ৭৫টি ওয়ার্ডে বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ড পরিচালনার জন্য টেন্ডারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়, যেখানে অংশ নিতে সিটি করপোরেশনে প্রায় ১৫ থেকে ১৭ লাখ টাকা জামানত দিতে হয়।
নিয়ম অনুযায়ী, একটি ফ্ল্যাট থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা এবং নির্ধারিত হারে অন্যান্য বর্জ্য সংগ্রহ ফি নেওয়ার কথা। তবে অভিযোগ উঠেছে, বাস্তবে এই নিয়ম মানা হচ্ছে না। কোথাও ফ্ল্যাটপ্রতি ১২০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে, ছোট দোকান থেকে ৪০০-৫০০ টাকা এবং বড় রেস্টুরেন্ট থেকে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
যদিও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক জানিয়েছেন, নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কোনো সুযোগ নেই এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে পুরো ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হবে।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমানে কোনো বৈধ টেন্ডার কার্যক্রম চালু নেই। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও প্রভাবশালী একটি চক্র নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে বর্জ্য সংগ্রহের কাজ নিয়ন্ত্রণ করছে।
কিছু এলাকায় নিয়মিত সেবা না পেয়ে বাসিন্দাদের বাড়তি টাকা দিয়ে ভ্যান ডাকতে হচ্ছে, আবার কোথাও রসিদ দিয়েও অনিয়মিত সেবা পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিদিন রাজধানী থেকে হাজার হাজার টন বর্জ্য অপসারণ করা হলেও এই খাতকে ঘিরে তৈরি হওয়া অস্বচ্ছ অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই খাত ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
