ভোরের কুয়াশা তখনও কাটেনি। তিস্তার বিস্তীর্ণ বালুচরের ওপর দিয়ে একটি ঘোড়ার গাড়ি ছুটে চলেছে। গাড়িতে বোঝাই ভুট্টার বস্তা, পাশে বসা কৃষক, চোখে-মুখে ক্লান্তি, তবু এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। এই দৃশ্য সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তাপাড়ের চর অঞ্চলের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
যেখানে আধুনিক সভ্যতার চাকা থামে, সেখান থেকেই শুরু হয় ঘোড়ার গাড়ির পথচলা।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের নদীবেষ্টিত ও দুর্গম চর অঞ্চলগুলোতে বিশেষত তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় যোগাযোগের একমাত্র নির্ভরযোগ্য বাহন হলো ঘোড়ার গাড়ি। পাকা সড়ক নেই, বর্ষায় জলমগ্ন পথ, শুকনো মৌসুমে ধুধু বালুচর, এই প্রতিকূল পরিবেশে মোটরযান চলার কোনো উপায় নেই। তাই স্থানীয় মানুষ আদর করে এই বাহনকে বলেন “চরের জাহাজ”।
বর্ষা মৌসুমে নৌকা আর শুকনো মৌসুমে ঘোড়ার গাড়ি, এই দুটি বাহনকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় লক্ষাধিক চরবাসীর জীবন।
তিস্তার চরে ধান, গম, ভুট্টা, মরিচ, পিয়াজ, তামাক, পাঠ ও সবজির ভালো ফলন হয়। কিন্তু উৎপাদিত ফসল হাটে নিয়ে যাওয়াই এখানকার কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ঘোড়ার গাড়ি না থাকলে সেই ফসল চরেই পড়ে থাকত।
স্থানীয় কৃষক আবুল কালাম বলেন —
”আমাদের চর অঞ্চলের একমাত্র যাতায়াত ব্যবস্থা হল ঘোড়ার গাড়ি। এখানে যে ধরনের ফসল ফলে, ভালো রাস্তাঘাট ও যাতায়াত ব্যবস্থা থাকলে আরো ভালো দাম পেতাম। এখন আদামাঙনা দামে দিতে হয়।
তরুণ কৃষক আতিকুর রহমান জানান-
আমার প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ মণ ভুট্টা হবে। কিন্তু যোগাযোগের সংকটের কারণে প্রতি মণে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কম দামে বিক্রি করতে হবে, কিছু করার নাই, সরকার আসবে সরকার যাবে প্রতিনিধিরা ওয়াদা দিবে কিন্তু পড়ে আর আমাদের দিকে কেউ দেখে না।রাস্তা ও যাতায়াত ভালো হলে আরো ভালো দাম পেতাম। এখন বাধ্য হয়ে কম দামে দিতে হচ্ছে।”
শুধু ফসল নয় শহরের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধ, এমনকি নির্মাণ সামগ্রীও চরে পৌঁছায় এই ঘোড়ার গাড়িতে করেই। মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা ও ঘোড়ার গাড়ি।
ঘোড়ার গাড়ি শুধু পরিবহনের মাধ্যম নয়, এটি অনেক পরিবারের আয়ের উৎসও। তিস্তার চর অঞ্চলে বহু তরুণ ও বেকার যুবক ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। একজন দক্ষ চালক প্রতিদিন গড়ে ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকা আয় করতে পারেন যা এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি সম্মানজনক রোজগার হিসেবেই বিবেচিত।
গাড়িগুলো তৈরিতেও রয়েছে স্থানীয় বুদ্ধিমত্তার ছাপ। পুরোনো মোটরগাড়ি চাকা ব্যবহার করে কাঠ ও বাঁশের কাঠামোয় তৈরি হয় এই গাড়ি কম খরচে টেকসই সমাধান।
চরের জীবনে বিপদ আসে হঠাৎ। নদী ভাঙন, অসুস্থ রোগী, প্রসূতি মা এই সংকটের মুহূর্তে হাসপাতালে পৌঁছানোর একমাত্র ভরসাও এই ঘোড়ার গাড়ি। কোনো অ্যাম্বুলেন্স আসে না এই বালুচরে। তাই জরুরি মুহূর্তে ঘোড়ার গাড়িই হয়ে ওঠে চরবাসীর ”অ্যাম্বুলেন্স”।
চরাঞ্চলে কোনো স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা ক্লিনিক নেই বললেই চলে। সামান্য জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে গুরুতর দুর্ঘটনা, সব ক্ষেত্রেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয় মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে। সেই দীর্ঘ পথের একমাত্র সঙ্গী এই ঘোড়ার গাড়ি।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন —
”গত বছর আমার ছেলের হঠাৎ জ্বর-খিঁচুনি উঠল রাত তিনটায়। কোনো গাড়ি নাই, রাস্তা নাই পাড়ার লোকজন ঘোড়ার গাড়িতে করেই হাসপাতালে নিয়ে গেল। ওই গাড়ি না থাকলে কী যে হতো ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।”
প্রসূতি মায়েদের অবস্থা আরও করুণ। প্রতি বছর বহু মা সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে ঘরেই সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হন। দক্ষ ধাত্রী বা চিকিৎসক না থাকায় মা ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি এই অঞ্চলে অস্বাভাবিকভাবে বেশি। ঘোড়ার গাড়ি সেই ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমায় তবে একটি পাকা রাস্তা ও একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দাবি এখানকার মানুষের বুকে বহু বছরের পুরোনো।
চরের শিশুদের কাছে স্কুলে যাওয়া মানেই একটি দীর্ঘ সংগ্রাম। বালুচর, মাঠ আর খাল পেরিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে বিদ্যালয়ে যাওয়া এখানকার ছাত্রছাত্রীদের প্রতিদিনের রুটিন। বর্ষায় পথ ডুবে গেলে স্কুলই বন্ধ। অনেক পরিবার এই কষ্টের কথা ভেবে মেয়েশিশুদের স্কুলে পাঠানো থেকে বিরত থাকেন ফলে ঝরে পড়ার হার এখানে উদ্বেগজনক।
এই পরিস্থিতিতে ঘোড়ার গাড়ি কোনো কোনো পরিবারের কাছে হয়ে উঠেছে “স্কুলবাস”। সকালে একই গাড়িতে চড়ে কয়েকজন শিশু একসাথে বিদ্যালয়ে যায়, বিকেলে ফেরে। যে পরিবারগুলো সামান্য ভাড়া দিতে পারেন, তাদের সন্তানরা এই সুবিধা পান।
স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোঃ মোস্তফা কামাল বলেন —
”আমাদের বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া অনেক শিশু বছরের মাঝপথে আসা বন্ধ করে দেয়। কারণ দূরত্ব, আর বর্ষায় পথ বন্ধ হয়ে যায়। ঘোড়ার গাড়ি চলে এমন দিনগুলোতে উপস্থিতি অনেক বেশি থাকে।”
চরে মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই বললেই চলে। অষ্টম শ্রেণির পর উপজেলা শহরে গিয়ে পড়তে হয়। সেই খরচ ও দূরত্ব বহন করার সামর্থ্য অনেক পরিবারের নেই, তাই বহু মেধাবী শিশুর পড়াশোনা প্রাথমিকেই থেমে যায়। শিক্ষকরা বলছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার অনেকটাই কমে আসত।
স্থানীয়রা বলছেন, সরকার যদি চরাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগ দেয়, তাহলে একদিকে যেমন কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাবেন, শিশুরা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যালয়ে যেতে পারবে, রোগী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাবে তেমনি এই অঞ্চলের সামগ্রিক জীবনমানও উন্নত হবে।
উন্নয়নের ঢেউ যখন শহরে-বন্দরে আছড়ে পড়ছে, তিস্তার বুকের এই চরগুলো তখনও অপেক্ষায়। ঘোড়ার গাড়ির খুরের শব্দ সেই অপেক্ষার নিরব ভাষা। এই মানুষগুলোর সংগ্রাম, তাদের স্বপ্ন সবকিছুই বাঁধা পড়ে আছে বালুচরের বুকে ছুটে চলা সেই পুরোনো গাড়ির সাথে।
চরের মানুষ চায় উন্নয়নের ছোঁয়া, একটু ভালো রাস্তা, একটু ভালো চিকিৎসা, একটু ভালো শিক্ষা, একটু ভালো জীবন। কবে লাঘব হবে অঞ্চলের মানুষের কষ্ট আর দুংখের গ্লানি, এখন এটায় প্রশ্ন, নাকি চর অঞ্চলের মানুষেরা মানুষ নয়, নাকি তারা এদেশের মানুষ নয়, যদি সবাই মানুষ হয় তা হলে তাদের জীবন মানের উন্নয়ন কোথায়?
আমার বাঙলা/আরএ
