ঢাকাই চলচ্চিত্রের অ্যাকশনধর্মী সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা আবুল খায়ের জসিম উদ্দিন, যিনি চলচ্চিত্রে জসিম নামেই পরিচিত। খলনায়ক হিসেবে অভিনয়ে অভিষেক হলেও পরবর্তী সময়ে নায়ক হিসেবেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করার ক্ষেত্রেও তার ছিল বিশেষ আগ্রহ।
১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন জসিম। আজ তার জন্মদিন। ১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মারা যান এই কিংবদন্তি অভিনেতা। তার মৃত্যুর পরও চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাকে স্মরণ করা হয়। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (এফডিসি) একটি ফ্লোর তার নামে ‘জসিম ফ্লোর’ হিসেবে পরিচিত।
শুধু অভিনেতা নন, মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন জসিম। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে মেজর হায়দারের নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন তিনি।
খলনায়ক থেকে জনপ্রিয় নায়ক
সত্তরের দশকের শুরুতে চলচ্চিত্রে পা রাখেন জসিম। ১৯৭২ সালে ‘দেবর’ সিনেমার মাধ্যমে অভিনয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। পরের বছর ‘রংবাজ’ সিনেমায় অ্যাকশন পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।
দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দোস্ত দুশমন’ সিনেমায় খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি পান জসিম। ভারতের জনপ্রিয় সিনেমা ‘শোলে’র আদলে নির্মিত এই সিনেমায় তিনি গাফফার চরিত্রে অভিনয় করেন। তার অভিনয় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
তবে খলনায়ক চরিত্রেই আটকে থাকেননি জসিম। ‘সবুজ সাথী’ সিনেমায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপর একের পর এক অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকদের প্রিয় নায়ক হয়ে ওঠেন। আশির দশকে শাবানা ও রোজিনার সঙ্গে তার জুটি বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়।
শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সিনেমায় তার অভিনীত চরিত্রও দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল। প্রায় দুই দশকের চলচ্চিত্রজীবনে দুই শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেন জসিম। তার উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘রংবাজ’, ‘দোস্ত দুশমন’, ‘এক মুঠো ভাত’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘সবুজ সাথী’, ‘লাইলী মজনু’, ‘জনি’, ‘সারেন্ডার’, ‘লালু মাস্তান’, ‘মাস্তান রাজা’, ‘কালিয়া’ ও ‘স্বামী কেন আসামি’।
জসিমের হাত ধরে চলচ্চিত্রে রিয়াজ
জসিমের চলচ্চিত্রজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায় রিয়াজকে আবিষ্কার করা। তখনো চলচ্চিত্রের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না রিয়াজের। বিমানবাহিনীতে বিমানচালক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর চাকরি হারিয়ে ঢাকায় আসেন তিনি।
রিয়াজের চাচাতো বোন ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ববিতা। একদিন তার সঙ্গে এফডিসিতে যান রিয়াজ। সেখানেই জসিমের নজরে পড়েন সুদর্শন তরুণ রিয়াজ। তাকে চলচ্চিত্রে নেওয়ার কথা ভাবেন জসিম এবং অভিনয়ের প্রস্তাব দেন।
১৯৯৪ সালের সেই ঘটনা বদলে দেয় রিয়াজের জীবন। অভিনয়ের কোনো পূর্বঅভিজ্ঞতা না থাকলেও জসিমের প্রস্তাব এবং ববিতার উৎসাহে চলচ্চিত্রে আসতে রাজি হন তিনি।
পরের বছর জসিমের সঙ্গে ‘বাংলার নায়ক’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান রিয়াজ। সিনেমাটিতে জসিম অভিনয় করেন ডন চরিত্রে, শাবানা ছিলেন রোকেয়া এবং রিয়াজ অভিনয় করেন মুন্না চরিত্রে। এটিই ছিল রিয়াজের চলচ্চিত্রে অভিষেক।
শুধু সুযোগ নয়, অভিনয়ও শিখিয়েছিলেন জসিম
নবাগত রিয়াজকে শুধু অভিনয়ের সুযোগ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি জসিম। তাকে অভিনয় ও অ্যাকশনের নানা কৌশলও শেখাতেন তিনি। পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জসিমকে স্মরণ করে রিয়াজ জানিয়েছেন, এফডিসিতে জসিমের শুটিং চলার সময় তিনি ফাইট প্র্যাকটিস করতেন। এমনকি নিজের শুটিং থাকলেও জসিম তাকে সময় দিয়ে অ্যাকশনের প্রশিক্ষণ দিতেন।
রিয়াজের ভাষ্য অনুযায়ী, জসিমের কারণেই তিনি ‘নায়ক রিয়াজ’ হয়ে উঠতে পেরেছেন। ‘বাংলার নায়ক’-এর পর খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি তাকে নিজের জায়গা তৈরি করতে। ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’সহ একের পর এক সফল সিনেমায় অভিনয় করে নব্বইয়ের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক হয়ে ওঠেন রিয়াজ।
তাই জসিমের জন্মদিনে তার অভিনয় ও অ্যাকশন তারকার পরিচয়ের পাশাপাশি বারবার ফিরে আসে রিয়াজকে আবিষ্কারের গল্প। একজন কিংবদন্তির চোখে সেদিন ধরা পড়া সেই তরুণই পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক।
সান নিউজ/ হুমায়রা
