প্রতি বছর ঈদ এলেই দেশের সড়কগুলো যেন আরও বেশি অনিরাপদ হয়ে ওঠে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এ সময় দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যায় আশঙ্কাজনক হারে, যার ফলে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে ধারাবাহিকভাবে। এবারের ঈদুল আজহার যাত্রাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। টাঙ্গাইলে অল্প ভাড়া বাঁচাতে রডবোঝাই ট্রাকে চড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন শ্রমিক। অন্যদিকে, নরসিংদীতে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ বহন করা এক পিতার মর্মান্তিক দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বিভিন্ন স্থানে বাস খাদে পড়ে যাওয়া কিংবা ট্রাক-বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণহানির খবর মিলছে নিয়মিত। যাত্রীদের অভিযোগ, বেপরোয়া ওভারটেকিং এবং প্রতিযোগিতামূলকভাবে গাড়ি চালানোই এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২১ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ঈদযাত্রায় ১৯৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪১ জন নিহত এবং ৫৪০ জন আহত হয়েছেন। সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, আগের তুলনায় কিছুটা কম মনে হলেও ভোগান্তি কমেনি। স্বল্প দূরত্বে দীর্ঘ সময় লাগাও সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ক্লান্ত চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা—এসবই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের মতে, সমস্যার মূল রয়েছে ব্যবস্থাপনা কাঠামোর দুর্বলতায়। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর তদারকি ছাড়া নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বছরজুড়ে কার্যকর নজরদারি জরুরি। শুধুমাত্র ঈদকেন্দ্রিক অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান আসবে না। বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন।
এদিকে মহাসড়কে নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি গতিতে যান চলাচল এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অনেক ক্ষেত্রে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে গাড়ি চলতে দেখা যায়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
যদিও সাম্প্রতিক ঈদগুলোর তুলনায় এবার দুর্ঘটনার সংখ্যা কিছুটা কম বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবুও সড়কে বেপরোয়া চলাচল অব্যাহত রয়েছে। ফলে সামনে ফিরতি যাত্রা ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
