কুড়িগ্রামের উলিপুরে ধামশ্রেণী ইউনিয়নে চৌমহনী বাজারে সরকারি বিধিমালা পুরোপুরি লঙ্ঘন করে দুটি স-মিল (করাতকল) স্থাপনের সত্যতা মিলেছে খোদ সরকারি তদন্তেই। উপজেলা বন কর্মকর্তার (ফরেস্টার) তদন্ত প্রতিবেদনে মিল দুটিকে সম্পূর্ণ অবৈধ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর দীর্ঘ দিন পার হলেও রহস্যজনক কারণে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। ওই এলাকার ভুক্তভোগী এলাকাবাসী, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মুসল্লিদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
উপজেলা বন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা যায়, করাতকল বিধিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে স-মিল স্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। তবে চৌমুহনী বাজারের এই দুটি স-মিল সরকারি বিধির তোয়াক্কা না করেই স্থাপন করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মো. হাবিবুর রহমানের স-মিলটি স্থানীয় চৌমহনী বাজার নূরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিং এবং চৌমহনী বাজার জামে মসজিদ থেকে মাত্র ২৫ ফিট দূরত্বে অবস্থিত। এর তীব্র ও বিকট শব্দের কারণে কোমলমতি শিশুদের লেখাপড়া এবং মুসল্লিদের নামাজ আদায় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, মো. মমিন মিয়ার স-মিলটি একটি ইসলামি ব্যাংক এবং বাজারের দোকান থেকে মাত্র ২০ ফিট দূরত্বে স্থাপন করা হয়েছে। ব্যাংকের মতো একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের এত কাছে করাতকল চলায় গ্রাহকদের আর্থিক লেনদেন ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তীব্র শব্দ ও পরিবেশ দূষণের হাত থেকে বাঁচতে এবং জনদুর্ভোগ নিরসনে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের পক্ষে মো. আবু সায়েম, নূর মোহাম্মদসহ বেশ কয়েকজন গণস্বাক্ষর সংবলিত একটি লিখিত অভিযোগ গত ১৪ জুলাই ২০২৫ ইং তারিখে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর দায়ের করেছিলেন।
উক্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইউএনও-র নির্দেশে সরেজমিনে তদন্ত সম্পন্ন করেন উপজেলা বন কর্মকর্তা। তিনি তদন্তে অভিযোগের শতভাগ সত্যতা পেয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদনটি ইউএনও কার্যালয়ে প্রেরণ করেন গত ২৫ নভেম্বর২০২৫ ইং তারিখে। দাপ্তরিক প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও অদৃশ্য কারণে প্রশাসন এখনো কোনো আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, স-মিল স্থানান্তরের বিষয়ে কথা বলতে গেলে মিল কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত রূঢ়, অশালীন ও হুমকিস্বরূপ আচরণ করে। প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় মিল মালিকরা এখন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এবং গভীর রাত পর্যন্ত স-মিল চালিয়ে যাচ্ছেন।
একজন ক্ষুব্ধ স্থানীয় ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তদন্তে যখন প্রমাণিত হলো যে মিল দুটি অবৈধ এবং এগুলো আমাদের মাদ্রাসা-মসজিদের পরিবেশ ধ্বংস করছে, তখন প্রশাসন কেন চুপ রয়েছে? আমরা বুঝতে পারছি না।
এ বিষয়ে স-মিল মালিক হাবিবুরের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি খুব ব্যস্ত আছি, রাতে কথা বলব বলেই ফোন কেটে দেন।
অন্য মালিক মমিনুল দাবি করেন, আমার স-মিল আগে স্থাপন করা হয়েছে, পরে ইসলামি ব্যাংক এসেছে। লাইসেন্সের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি লাইসেন্স নবায়নের জন্য বন বিভাগে যোগাযোগ করছি।
এ বিষয়ে উলিপুরের বর্তমান উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এ.টি.এম. আরিফ জানান, আমি এই উপজেলায় নতুন যোগদান করেছি, তাই বিষয়টি এখনো আমার জানা নেই। তবে প্রতিবেদনের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ধামশ্রেণী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারের শান্তিশৃঙ্খলা, ধর্মীয় পবিত্রতা এবং শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে এই অবৈধ করাতকল দুটি উচ্ছেদের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
