উমামা জামান মিম: এবারের বইমেলায় আপনার নতুন কী বই প্রকাশিত হচ্ছে?
উত্তর: প্রতি বছর বইমেলায় হয় আমার উপন্যাস, নয় গল্পের বই প্রকাশিত হয়। এবার গল্প-উপন্যাস কোনোটিই হচ্ছে না। যে উপন্যাসটি লিখছি সেটি শেষ করতে পারিনি। আরও বছরখানেক লাগবে। গল্পের পাণ্ডুলিপি আছে। কিন্তু গল্পগুলো এখন প্রকাশ করা যাবে না রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে। তাই এবার আসছে কেবল একটি গদ্যের বই। নাম: ‘মহাভারতে রাজ্যশাসন : রাষ্ট্রনায়কের প্রতি।’
প্রশ্ন: বইটি নিয়ে পাঠকদের কিছু বলুন।
উত্তর: প্রাচীনকালের এক অসামান্য সৃষ্টি পৌরাণিক মহাকাব্য মহাভারত। পৃথিবীতে যে কটি মহাকাব্য রয়েছে সেগুলোর মধ্যে আমি মহাভারতকে রাখি সর্বাগ্রে। কী নেই এই কাব্যে? মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তার এই মানবগাথা, রাজগাথা, বীরগাথা, প্রকৃতিগাথা ও জ্ঞানগাথার আখ্যান ও শ্লোকের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দিয়েছেন মানব-জীবনের সকল বোধ, উপলব্ধি, অনুভূতি, আনন্দ, বেদনা, চেতনা, শোক, তাপ, বিলাপ, পুরাণ, ইতিহাস, ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, যুদ্ধনীতি, তন্ত্রমন্ত্র, গার্হস্থ্যবিদ্যা, নৃত্যবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যাসহ নানা কিছু। এই মহাকাব্য আমাকে বিস্মিত করে, বিহ্বল করে।
এই মহাকাব্যে রাজ্যশাসন বিষয়ে মন্ত্রীশ্রেষ্ঠ কণিক, মহাজ্ঞানী বিদুর, দেবর্ষি নারদ এবং দেবব্রত ভীষ্মের উপদেশসমূহ আমি পুনর্লিখন করেছি নতুন আঙ্গিকে, কালোপযোগী ভাষায়। এই পুনর্লিখনের নাম দিয়েছি ‘মহাভারতে রাজ্যশাসন : রাষ্ট্রনায়কের প্রতি।’ এই বইয়ে মহাভারতের রাজ্যশাসন প্রসঙ্গ উল্লেখ হয়েছে বলে বইয়ের নাম ‘মহাভারতে রাজ্যশাসন’ প্রাসঙ্গিক। কিন্তু ‘রাষ্ট্রনায়কের প্রতি’ কেন? এই জন্য যে, রাজনীতি ও রাজ্যশাসন বিষয়ে মহাভারতপ্রোক্ত এই উপদেশসমূহ একজন কথক শোনাচ্ছেন একজন রাজনীতিবিদকে, যিনি শীঘ্রই শপথ গ্রহণ করবেন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে।
প্রশ্ন: বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কি এই বইয়ের বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করেছে?
উত্তর: হ্যাঁ, অনেকটাই করেছে। বইটি লেখার আগে দেশে শুরু হয় ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকট, দেশ চলে যায় এক গভীর খাদের কিনারে। আমার মনে তখন প্রশ্ন জাগে, রাজনীতিবিদদের কী কাজ? রাজনীতি কেন? এক পৃথিবীতে এত রাষ্ট্র কেন? এত এত রাষ্ট্রশাসকই-বা কেন? তাদেরই-বা কী কাজ? জনগণের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য কী? কোন মার্গ অবলম্বন করে একজন রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারেন জনহিতৈষী সুদক্ষ রাষ্ট্রনায়ক? কীভাবে তিনি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন একটি কল্যাণ রাষ্ট্র? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমি আবার শুরু করলাম মহাভারতের পাঠ। এবার কালীপ্রসন্ন সিংহ অনূদিত মহাভারত নয়, পড়লাম হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ ভট্টাচার্য অনূদিত মহাভারত। সত্যি পেয়ে গেলাম উত্তর।
রাষ্ট্রশাসন বিষয়ে মহাভারতপ্রোক্ত এই উপদেশসমূহ আমি বর্তমানের রাজনীতিবিদদেরও শোনাতে চাই। তারা রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব এই বিশাল মহাকাব্য পড়ে রাজ্যশাসন বিষয়ে উপদেশসমূহ উদ্ধার করা। আমিই উদ্ধার করে দিলাম। সংক্ষিপ্তভাবে লিপিবদ্ধ করলাম। তারা প্রাচীন গ্রন্থে উল্লিখিত প্রাচীন মানুষদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা মেলাবেন। রাষ্ট্র কী, কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়, কীভাবে রাষ্ট্র রক্ষা করতে হয়, কীভাবে জনসেবা করতে হয়―এরকম নানা বিষয়ে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতাকে আরও শানিত করবেন। কেবল বর্তমানের রাজনীতিবিদরা নন, অনাগত কালে যারা রাজনীতিতে আসবেন, তারাও পড়বেন এ বই। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, বইটি পাঠে তারাও উপকৃত হবেন। খুলে যাবে তাদের বোধের দরজা।
প্রশ্ন: শুরু থেকেই মেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছিল, এমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইভেন্টের প্রতি কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা আছে?
উত্তর: কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা এখনো পর্যন্ত আমার চোখে পড়েনি। মেলা আয়োজনের ব্যাপারে বাংলা একাডেমির প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতার ঘাটতি নেই বলেই জানি। এত বড়ো আয়োজন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতা ছাড়া প্রায় অসম্ভব। নির্বাচনের কারণেই মেলা নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল।
প্রশ্ন: সময় কমিয়ে আনা ও রমজানের কারণে মেলায় কেমন প্রভাব পড়বে?
উত্তর: ফেব্রুয়ারি মাস আটাশ দিন। বইমেলাও আটাশ দিনই হয়ে থাকে। এ বছর হবে পঁচিশ দিন। অনিবার্য কারণে মাত্র তিন দিন কমানো হয়েছে। কারণ উনিশ বা বিশ তারিখে ঈদ। কমানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। আমার মনে হয় না সময় কমানোর কারণে তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে রমজানের কারণে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও পড়তে পারে; যদিও আমি নিশ্চিত নই। কেননা আমার লেখকজীবনে আগে কখনো রমজান মাসে মেলা দেখিনি। আমি আশাবাদী থাকতে চাই যে, রমজানের কারণে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না।
প্রশ্ন: গত বছর মেলা নিয়ে প্রকাশকদের হতাশা দেখেছি, অনেকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল―এ বছর এমন কিছু আশঙ্কা আছে?
উত্তর: গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আমরা ঘটতে দেখেছি। এ বছর নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। তাই নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হতে হবে না বলে আমি আশাবাদী। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়।
প্রশ্ন: একটি সুন্দর বইমেলা আয়োজন করতে কী কী পদক্ষেপ নিলে ভালো হয়?
উত্তর: কেবল সত্যিকারের প্রকাশকদের স্টল বরাদ্দ দেওয়া। যারা নামধারী প্রকাশক, যারা মৌসুমি প্রকাশক, সারা বছর যাদের বই নিয়ে কোনো তৎপরতা থাকে না, যারা লেখকের সঙ্গে কোনো চুক্তি করে না, যারা লেখকদের কোনো রয়্যালটি দেয় না, যারা নিয়ম বহির্ভূতভাবে বই প্রকাশ করে তাদেরকে স্টল বরাদ্দ না দেওয়া। আমি মনে করি একটি সুন্দর বইমেলা আয়োজনের জন্য এই পদক্ষেপটাই প্রথমে নেওয়া দরকার। যার ইচ্ছে সে একটা স্টল বরাদ্দ নিয়ে নেবে, এটা হতে পারে না। এই লক্ষ্যে মেলা শুরু হয়নি। আর এটি একটি বইমেলা, কোনো বাণিজ্যমেলা নয়। বইমেলাকে বইমেলার মতো রাখা দরকার বলে মনে করি।
প্রশ্ন: মেলায় এবং সারা বছর যত বই প্রকাশিত হয় তার ডিজিটাল ডেটাবেইজ কি বাংলা একডেমি বা কোনো কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করতে পারে?
উত্তর: চাইলে তো অবশ্যই পারে। চাইলে বাংলা একাডেমিও পারে, চাইলে গণগ্রন্থাগারও পারে। এটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের ওপর নির্ভর করে। তারা এটা চান কিনা, সেটাই আসল কথা।
প্রশ্ন: বইমেলায় পাঠক-লেখক সম্পর্ক বা যোগাযোগের বর্তমান বাস্তবতা কী?
উত্তর: পাঠক ও লেখকের সম্পর্ক বা যোগাযোগের বর্তমান বাস্তবতা কী জানি না। তবে আমি মনে করি না লেখকের সঙ্গে পাঠকের কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগ থাকার দরকার আছে। লেখকের কাজ বই লেখা, পাঠকের কাজ বইটি সংগ্রহ করে পড়া। এক্ষেত্রে লেখকের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক বা যোগাযোগ থাকতে হবে কেন? এর কোনো দরকার নেই। পাঠকদের কাছ থেকে লেখক যত দূরে থাকবেন, তত ভালো। এটা আমার মত।
প্রশ্ন: প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে কিন্তু বইয়ের মান ও সম্পাদনা নিয়ে প্রকাশকরা কতটা সচেতন বলে মনে করেন?
উত্তর: নির্দিষ্ট কয়েকজন প্রকাশক ছাড়া বাকিরা একেবারেই সচেতন না। অধিকাংশ বই প্রকাশের আগে সম্পাদনা হয় না। প্রতি বছর বিস্তর বই প্রকাশকরা লেখকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছাপেন। লেখক যা দিচ্ছেন, হুবহু তা-ই ছেপে দিচ্ছেন। এ নিয়ে প্রতি বছরই আমরা কথা বলি, অথচ কোনো কাজ হয় না। যে বই বোঝে না, সাহিত্য বোঝে না, হয়তো সে কোনো বাইন্ডিংখানায় কাজ করত, সেও প্রকাশক বনে যাচ্ছে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। তবে আশার কথা, বেশ কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেছে, যারা লেখার গুণগত মান বিচার করেই বই প্রকাশ করে, পাণ্ডুলিপি যথাযথভাবে সম্পাদনার পর ছাপে। এটা আশা জাগানিয়া।
