যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আইপিও নিয়ে হাজির হচ্ছে স্পেসএক্স। বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকাশিত কোম্পানিটির নতুন নথিতে আর্থিক হিসাবের চেয়েও বেশি নজর কেড়েছে ইলন মাস্কের মহাজাগতিক খামখেয়ালিপনা ও অদ্ভুত সব তথ্য।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে লিখেছে, আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারে এক দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মোটা অংকের মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে কোম্পানিটি। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বুধবার জনসাধারণের জন্য ‘ইনভেস্টর প্রসপেক্টাস’ বা বিনিয়োগকারীদের জন্য তথ্য প্রকাশ করেছে স্পেসএক্স, যেখানে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার এমন অনেক তথ্য সামনে এসেছে, যা আগে জানা যায়নি।
এ নথিতে কোম্পানির পরিচালনা খরচ ও আয়ের নতুন হিসাবের পাশাপাশি, মহাবিশ্ব নিয়ে মাস্কের স্বভাবসুলভ কিছু বড় ঘোষণা এবং তার প্রযুক্তি সাম্রাজ্যের ভেতরের অদ্ভুত কিছু দিকও ফুটে উঠেছে। ৩০০ পৃষ্ঠারও বেশি দীর্ঘ এ প্রসপেক্টাসের পাতায় এমন কিছু তথ্য ও ঝুঁকির সতর্কতা ছড়িয়ে আছে, যা মাস্কের কোম্পানির খামখেয়ালিপনা ও তাদের মহাজাগতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই স্পষ্ট করে তোলে। এ ছাড়া নথিতে থাকা নানা আর্থিক বিবরণী থেকে জানা গেছে, মাস্কের বিভিন্ন ব্যবসা আসলে একে অপরের ওপর কতটা নির্ভরশীল এবং এর পেছনে কী কী ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারে স্পেসএক্সের এ যাত্রার মুখে তাদের জমা দেওয়া নথির ভেতরে লুকিয়ে থাকা অদ্ভুত কিছু তথ্যের দিকেই এবার নজর দেওয়া যাক।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাস্কের ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি টেসলার সঙ্গে মোটা অংকের ব্যবসা করেছে স্পেসএক্স। এ খরচের বড় একটি অংশ গেছে টেসলার ‘মেগাপ্যাক’ ব্যাটারি কিনতে, যেখানে ২০২৫ সালে পাঁচ কোটি ৬০ লাখ ডলার ও ২০২৪ সালে ১৯ কোটি ১০ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি সাইবারট্রাক কিনতেও দেদারসে অর্থ খরচ করেছে স্পেসএক্স।
প্রসপেক্টাস থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালে স্পেসএক্স খুচরা বাজার মূল্যে প্রায় ১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার সমমূল্যের সাইবারট্রাক কিনেছে। মডেল ও বিভিন্ন সুবিধার ওপর ভিত্তি করে এসব গাড়ির প্রতিটির দাম ছিল প্রায় ৬৯ হাজার ৯০০ ডলার থেকে ৯৯ হাজার ৯০০ ডলারের মধ্যে। এ দাম হিসাব করলে দেখা যায়, স্পেসএক্স অন্তত এক হাজার তিনশটি সাইবারট্রাক গাড়ি কিনেছে।
অটোমোবাইল শিল্পের বিক্রয় প্রতিবেদন অনুসারে, গেল বছর টেসলা গোটা বিশ্বে মোট ২০ হাজার ২৩৭টি সাইবারট্রাক বিক্রি করেছিল। যার মানে, টেসলার মোট সাইবারট্রাক বিক্রির বড় অংশই এসেছে মাস্কের নিজেরই কোম্পানি স্পেসএক্স থেকে। পুরো প্রসপেক্টাস জুড়েই স্পেসএক্স বারবার জোর দিয়ে বলেছে, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য চাঁদ ও মঙ্গলে মানব বসতি স্থাপন করা। যার মাধ্যমে মানব সভ্যতার পরবর্তী বিবর্তন ঘটবে এবং মহাবিশ্বে মানুষের উপস্থিতি আরও বাড়বে।
‘আমাদের চেনা একমাত্র আবাস পৃথিবী ছেড়ে বাইরে পাড়ি জমানোর মাধ্যমে আমরা মানব প্রজাতির টিকে থাকার বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করছি। ফলে আমাদের চেতনার আলো কেবল একটি গ্রহের মধ্যেই সীমিত থাকবে না। কারণ, পৃথিবী নির্মম মহাবিশ্বের অনিবার্য কোনো বিপদে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আমরা চাই না ডাইনোসরদের মতো মানুষের ভাগ্যও করুণ হোক।’
নথির এক জায়গায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি মঙ্গলে মানব জীবনের কাল্পনিক এক ছবি যোগ করেছে কোম্পানিটি, যেখানে দেখা যাচ্ছে, মঙ্গলের বুকে এক টুকরা জমিতে গোল গম্বুজ আকৃতির ঘরবাড়ি ও সারিবদ্ধ সোলার প্যানেলের মাঝে দাঁড়িয়ে একটি পরিবার রকেট উৎক্ষেপণ দেখছে।
বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো শোনানো এসব কথাবার্তা কেবল মুখের কথা বা তাত্ত্বিক বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মোটা অংকের আর্থিক স্বার্থ। স্পেসএক্স যদি ‘মঙ্গলে অন্তত ১০ লাখ মানুষের স্থায়ী বসতি’ করতে পারে তবে পুরস্কার হিসেবে মাস্ক কোম্পানির ১০০ কোটি শেয়ার পাবেন।
তবে স্পেসএক্সের এ আন্তঃগ্রহ অভিযানের মূল লক্ষ্যের কারণে বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু সতর্কবার্তাও দিয়েছে স্পেসএক্স। কোম্পানিটি বলেছে, ‘মহাবিশ্বের প্রকৃত রহস্য’ উন্মোচনের মতো এমন অস্বাভাবিক ব্যবসায়িক বিভিন্ন লক্ষ্য নিশ্চিত করা বেশ কঠিন হতে পারে।
‘আমাদের ব্যবসা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতের কৌশল এবং মানুষকে বহু-গ্রহে ছড়িয়ে দেওয়া, মহাবিশ্বের প্রকৃত রহস্য উন্মোচন ও চেতনার আলোকে তারার দেশে পৌঁছে দেওয়ার এই লক্ষ্য পূরণের পথে আমাদের সামনে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে।’
স্পেসএক্সের নথিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকির যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, সেখানে মাস্কের বিভিন্ন তদন্ত, মামলা ও কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত আইনি ও নিয়ন্ত্রণমূলক জটিলতার বড় চিত্র উঠে এসেছে। যার মধ্যে বেশ কয়েকটি বিষয় জড়িয়ে আছে মাস্কের এআই স্টার্টআপ এক্সএআইয়ের সঙ্গে, যা স্পেসএক্স এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে কিনেছে। প্রসপেক্টাসের একটি অংশে বলা হয়েছে, এক্সএআইয়ের তৈরি গ্রক চ্যাটবটটি, বিশেষ করে এর ‘স্পাইসি’ ও ‘আনহিঞ্জড’ বা খামখেয়ালি বা অনিয়ন্ত্রিত মোডগুলো মারাত্মক ক্ষতি তৈরির তীব্র ঝুঁকি রাখছে।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সম্ভাব্য আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি, ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো, সম্মতি ছাড়া বা নিপীড়নমূলক ছবি তৈরি, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি লঙ্ঘন ও এমন কনটেন্ট তৈরি করা, যা নিপীড়নমূলক, ক্ষতিকর, হয়রানি, গালিগালাজপূর্ণ বা বৈষম্যমূলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে’।
নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, মানুষের অনুমতি ছাড়া ছবি তৈরির অভিযোগের কারণে কোম্পানিটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একাধিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়ছে।
‘সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেইট’-এর হিসাব অনুসারে, এ বছরের শুরুতে গ্রক চ্যাটবটটি তার কনটেন্ট তৈরির ওপর কড়াকড়ি বাড়ানোর আগে কেবল ১১ দিনের ব্যবধানে ৩০ লাখেরও বেশি ‘যৌন উত্তেজক’ ছবি তৈরি করেছিল।
চ্যাটবটটি নিজেই স্বীকার করেছে, গ্রক ‘অপ্রাপ্তবয়স্কদের স্বল্পবসনা’ ছবি তৈরি করেছে। এর পর থেকে অপ্রাপ্তবয়স্কসহ বেশ কয়েকজন ব্যক্তি মামলা দায়ের করেছেন। তাদের অভিযোগ করেছেন, কোম্পানিটি যৌন নিপীড়ন ও শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট থেকে মুনাফা লাভ করেছে।
মাস্ক দীর্ঘদিন ধরেই নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও তাকে দেওয়া বিভিন্ন হুমকি নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। নিজের সুরক্ষার জন্য তিনি ব্যক্তিগত ফাউন্ডেশন ও একজন বিশ্বস্ত সহযোগীর মাধ্যমে ক্যালিফোর্নিয়া ও টেক্সাস উভয় অঙ্গরাজ্যেই নিরাপত্তা সেবাদাতা কোম্পানি নিবন্ধন করেছেন।
স্পেসএক্সের আর্থিক নথিতে উঠে এসেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোম্পানিটি মাস্কের এ নিরাপত্তা ফার্মে ক্রমাগত অর্থায়নের পরিমাণ বাড়িয়েছে। এ খাতের খরচ ছিল ২০২৩ সালে ২০ লাখ ডলার, ২০২৪ সালে ৩০ লাখ ডলার ও ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ লাখ ডলারে। এ বছর ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই তারা এ নিরাপত্তা সেবার পেছনে ১০ লাখ ডলার খরচ করেছে।
মাস্ক বারবার দাবি করেছেন, তাকে প্রায়শই প্রাণনাশের হুমকি ও নানা নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সংস্থা ও মানবিক সহায়তা কাটছাঁটের উদ্দেশ্যে গঠিত ‘ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি’ বা ডজ নামের উদ্যোগের প্রধান মুখ হয়ে ওঠার সময় থেকে তার এ ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
ঝুঁকির বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরার সময় স্পেসএক্স তাদের পণ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বেশ কিছু বড় ধরনের শঙ্কার কথা উল্লেখ করেছে। কোম্পানিটি বলেছে, তাদের বিপুল পরিমাণ খরচের কারণে বড় লোকসান হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের ৪৯০ কোটি ডলার ও এ বছরের প্রথম প্রান্তিকেই ৪৩০ কোটি ডলারের লোকসান। শেয়ার বাজারে যাওয়ার নথিপত্রে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও আয়ের অনিশ্চয়তার হিসাব দেওয়ার বিষয়টি সাধারণ নিয়মের মধ্যেই পড়ে। প্রসপেক্টাসে সরাসরি বলা হয়েছে, আমাদের অতীতেও নিট লোকসানের ইতিহাস রয়েছে এবং ভবিষ্যতে আমরা লাভজনক পর্যায়ে না-ও পৌঁছাতে পারি।
নথির অন্য এক জায়গায় স্পেসএক্স স্পষ্ট করে বলেছে, তাদের স্বপ্নকে সফল করতে হলে পরীক্ষামূলক এবং এখনও প্রমাণিত হয়নি এমন প্রযুক্তির পেছনে ক্রমাগত আরও অর্থ ঢেলে যেতে হবে।
‘তাদের ব্যবসার মূল ভিত্তি বা এসব বড় ঝুঁকি হয়ত শেষ পর্যন্ত কোনো কাজে নাও আসতে পারে। এ প্রসপেক্টাসে যেসব উদ্ভাবনী পণ্য ও সেবার কথা বলা হয়েছে, তার অনেকগুলোই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ এবং সেগুলোর পেছনে মোটা অংকের খরচ হতে পারে।’
সাননিউজ/আরএ
