মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর- বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে।
জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন এবং মূল্যস্ফীতির চাপ একত্রে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে দেশীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, বাজার সিন্ডিকেট, প্যানিক ক্রয় এবং সীমিত মজুত সক্ষমতা সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের উচ্চমাত্রার আমদানিনির্ভরতা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এই সংকটকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক সংঘাত সরাসরি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কার্যক্রম, কৃষি, পরিবহন এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এমন প্রেক্ষাপটে শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সরবরাহের উৎস বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কার্যকর নীতি সংস্কার গ্রহণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে যৌথ হামলা শুরু করে। এর জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ভয়াবহ সংকট তৈরি করেছে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে স্বল্প ও মধ্যমআয়ের দেশগুলো। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও শিল্পের কাঁচামালের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ বাড়ছে। এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি সাময়িক স্থিতিশীল মনে হলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর হতে পারে।
এদিকে ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় বসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধি দল। এই আলোচনা কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। পাকিস্তান ছেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধি দল। অবশ্য পরবর্তীতে আরও আলোচনা হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে সামনে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে যুদ্ধবিরতির ওপর। যদি যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়, তাহলে পরিস্থিতি আবার খারাপ হতে পারে।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমানো জরুরি। নেপাল-ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি, ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন ব্যবহার এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ আসছে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে।
তাদের মতে, হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।
জ্বালানি সরবরাহে নির্ভরযোগ্য অংশীদার নিশ্চিত না করলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন অনেকে।
বলা প্রয়োজন, গত এক দশক ধরে বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন করছে, যেখানে শিল্পায়ন, বাণিজ্য, রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ এবং পরিবহন সম্প্রসারণে জ্বালানি তেলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় তেল উৎপাদন সীমিত হওয়ায় মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ আমদানি-নির্ভর, বিশেষ করে ডিজেল ও অকটেন। কৃষি, শিল্প, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ খাতে ডিজেলভিত্তিক মেশিনারি ও যানবাহনের বিস্তৃত ব্যবহার অর্থনীতিকে সরবরাহের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে তেলের বাজারে সংকট স্পষ্টভাবে লক্ষ করা গেছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো, অনেক পাম্পে ‘সোল্ড আউট’ এবং ডিজেল মজুত না থাকার খবর সাধারণ মানুষের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সরকারের বারবার ‘মজুত রয়েছে’, ‘সরবরাহ বন্ধ হয়নি’ ইত্যাদি ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে বাজারে ভিড় ও হুড়োহুড়ি দেখা যায়। সর্বশেষ দেশে তেলের দাম বাড়ানো হয়। এখন অবশ্য তেলের পাম্পগুলোতে আর দীর্ঘ লাইন নেই।
বাংলাদেশে তেলের প্রধান সরবরাহকারী তিনটি সরকারি কোম্পানি পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম এবং যমুনা অয়েল কোম্পানি। তারা আনুমানিক দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৮০০টি পাম্পে তেল বিতরণ করে। বছরে প্রায় সাড়ে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টন তেল আমদানি হয়, যার বড় অংশ পরিশোধিত। ২০ শতাংশ কাঁচা তেল দেশেই রিফাইন্ড হয়। এমনতর চাহিদার বড় অংশ হরমুজ প্রণালি পথ দিয়ে আসে। তাই হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
তেলের সরবরাহ-সংকটের মূল দুই কারণ রয়েছে। প্রথমটি আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক চাপ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীলতা। দ্বিতীয়টি দেশীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মার্কেট সিন্ডিকেট, প্যানিক ক্রয়, দুর্নীতি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অভাব।
বলা প্রয়োজন, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো হরমুজ প্রণালি। প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং ২৫ শতাংশের বেশি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় এই রুটে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে এবং অনেক বিমা কোম্পানি যুদ্ধ ঝুঁকির বিমা প্রত্যাহার করেছে। এর ফলে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিশ্ববাজারে দাম দ্রুত বাড়ছে। এরইমধ্যে লোহিত সাগর ও হরমুজ অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৃহৎ তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ভাড়া প্রায় ৩২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি চার দশমিক সাত শতাংশ থেকে কমে দুই দশমিক পাঁচ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একইসঙ্গে জ্বালানি দামের উল্লম্ফনে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।
এমন প্রেক্ষিতে দেশের অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশের উচিত এ পরিস্থিতি মাথায় রেখে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া। বিশেষ করে জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা (স্টোরেজ ক্যাপাসিটি) বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া।
বাংলাদেশ সরাসরি হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী না হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে হরমুজ দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে তার অভিঘাত আমাদের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়বে, তা প্রায় অনিবার্য।
আরো বলা প্রয়োজন, বাংলাদেশের মোট জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল এবং এলএনজিÑ সবকিছুর ক্ষেত্রেই আমদানি নির্ভরতা রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী। এদের বেশিরভাগ রপ্তানি পথই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
যদি দীর্ঘমেয়াদে প্রণালিটি অচল হয়ে পড়ে, তবে প্রথম ধাক্কা আসবে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার মাধ্যমে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাবে। মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং শিল্প উৎপাদনে। বাংলাদেশে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে। সরকার তেলে ভর্তুকি দিচ্ছে। এতে করে বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে- আর ভোক্তা পর্যায়ে বর্তমানে দাম বাড়ার ফলে মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হবে; এবং হচ্ছেও।
তেলের দাম বাড়লে শুধু জ্বালানি খাতেই প্রভাব পড়ে না, এটি অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই ছড়িয়ে পড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। কৃষি খাতে সেচ ও যান্ত্রিকীকরণের ব্যয় বাড়ে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করছে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট হলে, তা সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে, যা টাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানিনির্ভর অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়বে। ফলে এক ধরনের ‘দ্বৈত চাপ’ তৈরি হবে। একদিকে আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি, অপরদিকে বিনিময় হারজনিত চাপ।
অনেকের পরামর্শ, সোলার এনার্জির কথা ভাবা যেতে পারে। আরো ভাবা যেতে পারে ইলেকট্রিক যানবাহনের বিষয়টি। অর্থাৎ জ্বালানি খাতে বহুমুখীকরণ, মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের বাইরেও এই যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো জোটেও বিভাজন সৃষ্টি করছে।
যুদ্ধের ফলে তেল-গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং ইউরিয়া, হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মতো কাঁচামালের ঘাটতি বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।
এদিকে বাংলাদেশকে উচ্চ দামে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। যুদ্ধ শেষ হলেও হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপ হলে জ্বালানি আমদানি খরচ আরও বাড়বে।
কৃষি ও রপ্তানি খাতেও বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইউরিয়া ও ডিজেল সংকট খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে, অন্যদিকে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের বিকল্প রুট ব্যবহারে পরিবহন খরচ ও বিমা প্রিমিয়াম বেড়ে যাচ্ছে, যা রপ্তানি প্রতিযোগিতাকে দুর্বল করছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে এসব দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
তেলের দাম বৃদ্ধি প্রথমদিকে এসব দেশের রাজস্ব বাড়াতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সামরিক উত্তেজনা, বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা ও বাণিজ্য বিঘ্নিত হলে শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। সে ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প। এই খাতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি সংকট দেখা দিলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, যা রপ্তানি আদেশ পূরণে সমস্যা তৈরি করবে।
অপরদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ইউরোপ ও আমেরিকার ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতায়ও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাব এলে পোশাকের মতো পণ্যের চাহিদা কমে যায়। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হ্রাসের ঝুঁকিও তৈরি হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বৈশ্বিক এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প টেকসই ব্যবস্থা কী হতে পারে?
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হবে জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের উৎস যেমন আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা লাতিন আমেরিকা থেকে তেল ও এলএনজি আমদানির চুক্তি বাড়ানো যেতে পারে। যদিও পরিবহন ব্যয় কিছুটা বেশি হতে পারে, তবু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এটি কার্যকর। দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানো জরুরি। সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ালে আমদানিনির্ভরতা কমবে।
অনেক দেশ কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ গড়ে তোলে, যাতে বৈশ্বিক সংকটের সময় কয়েক মাসের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। স্বল্প মেয়াদে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করা গেলে আকস্মিক সরবরাহ ব্যাহত হলেও তাৎক্ষণিক সংকট এড়ানো সম্ভব।
শুধু সরবরাহ বাড়ানো নয়, চাহিদা ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প ও পরিবহন খাতে জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যুৎ অপচয় কমাতে স্মার্ট গ্রিড ও আধুনিক বিতরণ ব্যবস্থা জরুরি। ব্যক্তিগত পর্যায়েও গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ, শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় পথ। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি ও গ্যাস পাইপলাইন সংযোগ বাড়ানো গেলে বহুমাত্রিক সরবরাহ নিশ্চিত হবে। এছাড়া, বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে কোনো একক অঞ্চলের অস্থিরতা আমাদের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব না ফেলে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রবাসী আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ অর্থনীতিকে বহিরাগত ধাক্কা মোকাবিলায় সক্ষম করে। একইসঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী রাখতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে নিম্নআয়ের মানুষ বিপদে না পড়ে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি প্রবাহের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে না থেকেও অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে গভীর সংকটে পড়তে পারে। তবে সংকটের আশঙ্কাই হতে পারে নীতি সংস্কারের সুবর্ণ সুযোগ। জ্বালানি বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ, কৌশলগত মজুত এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা ইত্যাদি পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করতে পারলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করা সহজতর হবে। এখনই চাই দূরদর্শী পরিকল্পনা ও বাস্তবমুখী নীতি-পদ্ধতির প্রয়োগ।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক।
সাননিউজ/আরএ
