যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার সংলাপ নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তান ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ চালালেও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ইরান সংলাপে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তেহরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র অবরোধের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করায় তারা এমন পদক্ষেপ নিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি জাহাজে হামলার খবরও আসছে। এ অবস্থায় আগামী বুধবার শেষ হচ্ছে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানে আবারও হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল।
গত সপ্তাহের শেষার্ধে লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ যুদ্ধবিরতি ইতোমধ্যে লঙ্ঘন করেছে ইসরায়েল। আলজাজিরা জানায়, গতকাল শনিবার তারা দক্ষিণ লেবাননে বিমান হামলা চালিয়েছে। ওই এলাকার অনেক বাসিন্দা বাড়িতে ফিরলেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন।
দুই সপ্তাহের চলমান যুদ্ধবিরতির শেষ প্রান্তে এসে উত্তেজনার পালে নতুন করে হাওয়া দিচ্ছে হরমুজ। এতে সন্দেহের সৃষ্টি হচ্ছে– যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গোপন বা ব্যাক চ্যানেলের আলোচনা ভালো চলছে কিনা। দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা ফেরাতে গতকাল তিন দিনের তেহরান সফর শেষ করেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব সফর করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তারা সমঝোতার জন্য উঠেপড়ে লাগলেও তা কতটুকু সফলতার মুখ দেখবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ইরানের এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনার তারিখ এখনও নির্ধারিত হয়নি। ১১ এপ্রিল পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনার পর ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ বলেন, উভয় পক্ষ ‘কাঠামোর বিষয়ে একমত না হওয়া পর্যন্ত’ দ্বিতীয় দফার আলোচনার তারিখ নির্ধারণ করা যাবে না।
তুরস্কের আন্তালিয়ায় একটি কূটনৈতিক ফোরামে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সাঈদ খাতিবজাদেহ বলেন, ‘আমরা এমন কোনো আলোচনা বা বৈঠকে অংশ নিতে চাই না, যা ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং যা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করার অজুহাত হিসেবে কাজ করতে পারে।’
ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের (ইউকেএমটিও) উদ্ধৃতি দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির সঙ্গে যুক্ত দুটি গানবোট হরমুজ প্রণালির কাছে একটি ট্যাঙ্কারের ওপর গুলি চালিয়েছে। ইউকেএমটিও জানায়, ঘটনাটি ঘটেছে ওমানের ২০ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে। ট্যাঙ্কারটির ক্যাপ্টেন জানিয়েছেন, দুটি গানবোট কোনো রেডিও বার্তা না দিয়েই গুলি চালানো শুরু করে।
হরমুজ নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে দূর থেকে ভেসে আসছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গর্জনও। আলজাজিরা জানায়, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে তেহরানের মনোভাব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। গতকাল তিনি বলেন, আলোচনা এগোলেও ইরান কিছুটা ‘চালাকি’র চেষ্টা করছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কঠোর।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছেন, তারা অবিশ্বাস ও ঔদ্ধত্যের অগ্রভাগে থাকা দুটি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রতিরোধের অঙ্গীকার করেছেন। গতকাল সেনা দিবস উপলক্ষে টেলিগ্রামে পাঠানো এক বার্তায় মোজতবা বলেন, ইরানের সেনাবাহিনী ‘বিশ্বের সামনে তাদের দুর্বলতা ও অপমান উন্মোচন করেছে’ এবং ‘এর ড্রোনগুলো মার্কিনি ও জায়নবাদী অপরাধীদের ওপর বিদ্যুতের মতো আঘাত হানে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এর সাহসী নৌবাহিনী শত্রুদের নতুন পরাজয়ের তিক্ততা আস্বাদন করাতে প্রস্তুত।’
খামেনি সাম্প্রতিক এ যুদ্ধকে ইরানের বিপ্লবী ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবকে পূর্ববর্তী দুটি ‘চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের’ মাধ্যমে বর্তমান সংঘাতের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় তাঁর বাবা নিহত হওয়ার পর তিনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন। তবে তাঁকে এখনও জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ইরানে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি এটিকে ইরানের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ বলে বর্ণনা করেন।
এক বিশ্লেষক বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের সরাসরি ফল হলো হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ। অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশম তেহরান থেকে আলজাজিরাকে বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী প্রণালিটি খুলে দেওয়ার কথা ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের এ অবরোধ নিজেই যুদ্ধবিরতির শর্তের লঙ্ঘন।’ তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আরও সেনা ও সরঞ্জাম নিয়ে আসছে, যা আরেকটি লঙ্ঘন।’
তিনি বলেন, গত শুক্রবার রাতে ইরান প্রণালিটি খোলার একটি সীমিত প্রচেষ্টা চালানোর পর ট্রাম্প মিথ্যা বিবৃতি দিয়ে গণমাধ্যমের কাছে ছুটে যান। ফলে তেহরান এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, তাদের প্রণালিটি আবার বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে খোশচেশম বলেন, ‘এখন পরিস্থিতি সত্যিই কঠিন। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি কঠিন। ট্রাম্প প্রতি ঘণ্টায় তাঁর অবস্থান ও কথা পরিবর্তন করছেন।’ ট্রাম্পের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, ন্যাটো প্রতিশ্রুতি ও একাধিক আন্তর্জাতিক চুক্তি পরিত্যাগকে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, ট্রাম্প ‘এমন কেউ নন যার সঙ্গে আলোচনা করা যায়। তিনি জাতিসংঘ বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি কোনো ধরনের সম্মান দেখান না। আমার মতে, যে কোনো ধরনের আলোচনার চেয়ে যুদ্ধ পুনরায় শুরুর শঙ্কাই বেশি।’
ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) গতকাল দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছে। তাদের মতে, হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। দক্ষিণ লেবাননে গাজার মতো একটি ‘হলুদ রেখা’ তৈরির কথাও জানিয়েছে আইডিএফ।
গতকাল আলজাজিরা জানিয়েছে, লেবাননে একজন ফরাসি শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। হামলার খবর নিশ্চিত করেছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামও। তিনি বলেন, লেবাননে জাতিসংঘের ফরাসি শান্তিরক্ষীরা হামলার শিকার হয়েছেন। তিনি এ ঘটনার জরুরি তদন্তের আহ্বান জানান। তবে কারা এ হামলা চালিয়েছে, তা তিনি বলেননি।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থামাতে ব্যর্থতার কারণে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে তাদের নীতি পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও সমালোচনা করেছেন, যিনি নিয়মিত সামাজিক মাধ্যমে ইরানকে লক্ষ্য করে হুমকিমূলক বার্তা পোস্ট করেন।
বার্সেলোনায় প্রগতিশীল নেতাদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে লুলা বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় এমন একজন প্রেসিডেন্টের টুইট শুনতে পারি না, যিনি বিশ্বকে হুমকি দেন ও যুদ্ধ ঘোষণা করেন।’
হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টাকারী দুটি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজের ওপর গতকাল হামলা হয়েছে। এ ঘটনায় নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠিয়েছে ভারত। পাশাপাশি ভারতের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ভারত সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, আক্রান্ত জাহাজগুলোর মধ্যে একটির নাম সানমার হেরাল্ড। সূত্রটি আরও জানায়, জাহাজের নাবিক দল এবং জাহাজটি নিরাপদ রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তা ইরানি রাষ্ট্রদূতকে ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে ভারতের মনোভাব পৌঁছে দিতে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রণালিটি পেরিয়ে ভারতগামী জাহাজগুলোকে সুবিধা দেওয়ার প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করতে বলেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রদূত এই মতামত ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেবেন।
সান নিউজ/আরএ
