জীবনের পথপরিক্রমায় কখনো কখনো একটি দুর্ঘটনাই কেড়ে নেয় মানুষের সাজানো-গোছানো পৃথিবী। স্বপ্ন, সম্ভাবনা, কর্মময় অতীত আর পরিচিত জীবনের ঠিকানা মুহূর্তেই পরিণত হয় অনিশ্চয়তার দীর্ঘ অধ্যায়ে। একসময় যিনি ছিলেন মেধাবী শিক্ষার্থী, শিক্ষকতা করতেন, ঢাকায় করতেন চাকরি; আজ তাঁর রাত কাটে ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায়। মাথার ওপর নেই নিরাপদ ছাদ, জীবিকা নির্বাহের নেই কোনো স্থায়ী অবলম্বন। মানুষের দেওয়া খাবার আর সামান্য সহযোগিতায় কোনো রকমে টিকে আছে তাঁর জীবন।
বলছি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার সলপ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের হাড়িভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা দেওয়ান বংশের সন্তান মো. দেওয়ান আব্দুল খালেকের কথা। বয়স ৬০ পেরিয়েছে। জীবনের একসময় শিক্ষা, কর্মদক্ষতা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে যাঁর ছিল স্বতন্ত্র পরিচিতি, সেই মানুষটিই এখন ঠিকানাহীন এক অসহায় জীবনের প্রতিচ্ছবি। প্রায় চার দশক ধরে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় দিন কাটছে তাঁর। এর মধ্যে গত চার বছর ধরে সলপ ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের বারান্দাই হয়ে উঠেছে তাঁর রাতযাপনের আশ্রয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আব্দুল খালেকের জীবনের সূচনা ছিল সম্ভাবনাময়। পড়াশোনায় ছিলেন মেধাবী। এলাকায় শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াতেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকায় চাকরিও করতেন। কর্মব্যস্ততা, আত্মনির্ভরতা আর স্বাভাবিক জীবনযাপনের মধ্যেই এগিয়ে যাচ্ছিল তাঁর দিনগুলো। কিন্তু একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন তাঁর জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
সলপ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. রাকিবুল ইসলাম আকন্দ জানান, আব্দুল খালেক তাঁর প্রতিবেশী। একসময় তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। এলাকায় শিক্ষকতা করার পাশাপাশি ঢাকায় ভালো চাকরিও করতেন। তবে ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে একদিন ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। দুর্বৃত্তরা তাঁর ব্যাগে থাকা প্রায় ৪০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁকে অচেতন অবস্থায় ফেলে রেখে যায়। স্থানীয় ইউপি সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর থেকেই তাঁর আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। ক্রমেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তিনি। এরপর আর ফিরে পাওয়া হয়নি আগের সেই স্বাভাবিক জীবন।
একটি ঘটনার অভিঘাতে বদলে যায় জীবনের চেনা মানচিত্র। যে মানুষটি একসময় অন্যকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার স্বপ্ন দেখতেন, যাঁর ছিল নিজের উপার্জনে বেঁচে থাকার সামর্থ্য, সেই মানুষটিকেই আজ প্রতিটি দিনের খাবারের জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে অন্যের সহযোগিতার ওপর। সময়ের প্রবহমানতায় বদলেছে চারপাশ, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা; কিন্তু আব্দুল খালেকের জীবনে যেন থমকে আছে অনিশ্চয়তার এক দীর্ঘ অধ্যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় চার বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের বারান্দায় রাত কাটাচ্ছেন তিনি। এর আগে কখনো কৃষকগঞ্জ বাজারসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করতেন। স্থানীয় কেউ খাবার দিলে খান, কেউ সহযোগিতার হাত বাড়ালে তা গ্রহণ করেন। কারও দেওয়া একবেলার আহার, কারও সামান্য সহমর্মিতাই তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন। নিজের প্রয়োজন কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে সুসংগঠিতভাবে কথা বলার অবস্থাও তাঁর নেই বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা
প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর যখন মানুষ কর্মস্থল থেকে ঘরে ফেরে, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কাটে তাদের সন্ধ্যা, নিরাপদ আশ্রয়ে শুরু হয় বিশ্রামের প্রস্তুতি; তখন আব্দুল খালেকের জন্য রাতের ঠিকানা হয় ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দা। দিনের কোলাহল স্তিমিত হলে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যেই একটি অনিশ্চিত রাত পার করেন তিনি। নেই নিজস্ব বিছানা, নেই নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা, নেই এমন কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা, যেখানে নিরাপদে কাটতে পারে তাঁর দিন ও রজনী।
তাঁর বর্তমান অবস্থার সঙ্গে অতীতের ব্যবধান যেন আরও বেশি বেদনাবিধুর। একসময় যাঁর ছিল শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মজীবন ও সামাজিক পরিচিতি, আজ তাঁর পরিচয় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে আশ্রয়হীন এক অসহায় মানুষ হিসেবে। অথচ বয়সের এই প্রান্তে এসে তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপত্তা, নিয়মিত আহার, চিকিৎসা এবং মানুষের নিবিড় পরিচর্যা।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, কেবল ব্যক্তিগত সহানুভূতি কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে খাবার দেওয়ার মাধ্যমে আব্দুল খালেকের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাঁর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। পরিবারের সদস্যদের সন্ধান ও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি তাঁর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, নিরাপদ আবাসন এবং নিয়মিত দেখভালের ব্যবস্থা করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট মানবিক সংগঠনগুলোর কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।
আব্দুল খালেকের জীবনকাহিনি নিছক একজন আশ্রয়হীন মানুষের দুর্দশার বিবরণ নয়; এটি আমাদের সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানবিক সংবেদনশীলতার প্রতিও এক নীরব প্রশ্ন। একজন মানুষ একসময় কী ছিলেন, তাঁর জীবনে কী সম্ভাবনা ছিল সেসবের চেয়েও বড় কথা, আজ তিনি কেমন আছেন এবং তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা কী করছি।
যে বারান্দায় রাত কাটে আব্দুল খালেকের, সেটি কোনো মানুষের স্থায়ী আবাস হওয়ার কথা নয়। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা এই মানুষটির প্রয়োজন এখন করুণা নয়, প্রয়োজন মর্যাদাপূর্ণ বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। প্রয়োজন এমন একটি নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে রাত নামলে তাঁকে আর খোলা বারান্দায় শুয়ে থাকতে হবে না; প্রয়োজন এমন চিকিৎসা ও পরিচর্যা, যা তাঁকে অন্তত কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
হারিয়ে যাওয়া অতীত হয়তো আর ফিরবে না। কিন্তু মানবিক উদ্যোগে তাঁর বর্তমান জীবনের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও লাঘব করা সম্ভব। চার বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় রাত কাটানো আব্দুল খালেকের জীবনে এবার ফিরুক নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চয়তা এমন প্রত্যাশাই স্থানীয় সচেতন মানুষের।
সাননউিজ/বান্না
