দেশের বস্ত্রশিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নরসিংদী। একসময় গৌরব ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত তাঁতশিল্পের এই জনপদে হস্তচালিত তাঁতের জায়গা দখল করে নেয় আধুনিক বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নরসিংদীর চৌয়ালা, মাধবদী, বিলাসদী, খাটেহারা, হাজীপুর, হাসনাবাদ ও কারারচরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে অসংখ্য টেক্সটাইল শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব এলাকার মধ্যে চৌয়ালা শিল্পাঞ্চল অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
একবিংশ শতাব্দীতে মানুষের জীবনযাত্রার মান ও পোশাকের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সম্প্রসারিত হয় নরসিংদীর টেক্সটাইল শিল্প। এ খাতে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ ও বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে উদ্যোক্তারা গড়ে তোলেন অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সৃষ্টি হয় বিপুল কর্মসংস্থানের। নরসিংদীর স্থানীয় শ্রমিকদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা লাখ লাখ শ্রমিক এ শিল্পে কাজ করছেন। পাশাপাশি এ খাত থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্বও পেয়ে থাকে।
কিন্তু সম্ভাবনাময় এ শিল্প এখন গভীর সংকটের মুখে। বিশেষ করে টেক্সটাইল খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাওয়ারলুম বা কাপড় বয়নশিল্পের মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের বোঝা বহন করছেন। তাদের অভিযোগ, একদিকে ব্যাংকঋণের সুদের চাপ, অন্যদিকে সুতার অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং কাপড়ের বাজারদরে অসামঞ্জস্য—সব মিলিয়ে তারা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।
টেক্সটাইল শিল্পের সঙ্গে স্পিনিং মিল, সাইজিং মিল, সুতা ব্যবসায়ী, কাপড় ব্যবসায়ীসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী জড়িত। এ শিল্পের প্রতিটি স্তর একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। অথচ পাওয়ারলুম মালিকদের দাবি, উৎপাদন প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েও তারা ন্যায্য ব্যবসায়িক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, সুতার দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে কাপড়ের দাম বাড়ছে না। ফলে উৎপাদন খরচ মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।
পাওয়ারলুম মালিকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে দফায় দফায় সুতার দাম বাড়ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলেও কাপড়ের বাজারদর অনেক ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত থাকছে। অন্যদিকে ব্যাংকঋণের সুদ, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাদের পুঁজি ক্রমেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাদের আরও অভিযোগ, সুতা ব্যবসায়ীদের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। উৎপাদিত সুতার প্যাকেট বা বস্তায় নির্ধারিত মূল্য উল্লেখ না থাকায় ক্রেতাদের প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, একই দিনে কয়েক দফা সুতার দাম পরিবর্তন হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ এবং কাপড়ের ন্যায্য মূল্য ঠিক করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
পাওয়ারলুম মালিকরা বলছেন, উৎপাদিত সুতার মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা, বাজার তদারকি এবং কার্যকর নীতিমালা থাকলে এ ধরনের অনিয়ম ও অস্থিরতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে কার্যকর সরকারি উদ্যোগ ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব রয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
তাদের মতে, নরসিংদীর টেক্সটাইল শিল্প শুধু কয়েকজন উদ্যোক্তার ব্যবসা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লাখো শ্রমিকের জীবিকা, অসংখ্য পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং দেশের বস্ত্র সরবরাহব্যবস্থা। তাই এ শিল্পের সংকটকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এ অবস্থায় পাওয়ারলুম মালিকদের দাবি, সুতা ও কাপড়ের বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সুতার প্যাকেটে মূল্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা, ব্যাংকঋণের সুদ ও আর্থিক চাপ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ে একটি বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি।
নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী টেক্সটাইল শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এখনই প্রয়োজন মালিক, শ্রমিক, সুতা উৎপাদনকারী, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ। অন্যথায় দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা এ শিল্পাঞ্চলের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।
সাননিউজ/বান্না
