🔥 ইসরায়েল নির্বাচন: এক নজরে
প্রেক্ষাপট: আঞ্চলিক যুদ্ধ, আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্য ও গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে ২০১৯ সালের পর দেশটির ষষ্ঠ নির্বাচন।
প্রধান লড়াই: দুর্নীতির মামলার খড়্গ মাথায় নিয়ে ফের ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে আছেন দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
ভোটের অঙ্ক: ৭৩ লাখ ভোটারের এই নির্বাচনে ১২০টি আসনের মধ্যে সরকার গড়তে ম্যাজিক ফিগার ৬১টি আসন দরকার, যা কোনো দলের পক্ষেই একা পাওয়া অসম্ভব।
মূল সংকট: নিরাপত্তা ব্যর্থতা, অতি-কট্টর ইহুদিদের সামরিক ছাড় বিতর্ক এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে দেশজুড়ে চরম অসন্তোষ।
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা ও লেবাননের আকাশে বারুদের গন্ধ আর দেশের ভেতরে চরম রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে ইসরায়েল. দেশটির পার্লামেন্ট বা নেসেটের ২৬তম এই নির্বাচন ঘিরে ভূমধ্যসাগরীয় দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন এখন দারুণ উত্তপ্ত।
বিশেষ করে ফিলিস্তিনে চলমান আগ্রাসন এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের আবহে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ভোট দেশটির ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতার লড়াইয়ে নেতানিয়াহু : ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘতম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরও একবার মসনদে বসার জন্য মরিয়া হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রায় দুই দশক ধরে দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক আসনে থাকা নেতানিয়াহুর মাথার ওপর ঝুলছে দুর্নীতির মামলার খড়্গ।
তা সত্ত্বেও ডানপন্থী দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করছেন। তার দল লিকুদ পার্টি এবং কট্টরপন্থী জোটগুলোর বিপরীতে এবার শক্ত অবস্থান নিয়েছে ইহুদি নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী বিরোধী জোট।
ভোট উৎসবের পরিসংখ্যান ও জটিল সমীকরণ : নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্য থেকে প্রায় ৭৩ লাখ নাগরিক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সকাল সাতটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত খোলা থাকবে ভোটকেন্দ্রগুলো।
ইসরায়েলের নির্বাচনী নিয়ম বেশ জটিল। দেশটির ১২০ সদস্যের পার্লামেন্টে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা সরকার গঠনের জন্য ম্যাজিক ফিগার হলো একষট্টি আসন। তবে দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসের কোনো দলই আজ পর্যন্ত একা এই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের নিয়মে তিন দশমিক পঁচিশ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়া দলগুলোই কেবল পার্লামেন্টে জায়গা করে নেয়। নির্বাচনে কোনো পক্ষই নিরঙ্কুশ জয় পাবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার ফলে ভোট শেষে জোট গঠনের জন্য দলগুলোকে কঠিন দরকষাকষির মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
কারা দিচ্ছেন ভোট, আর কারা বাদ : ভোটার তালিকার এই বৃত্তে নাগরিক অধিকারের নানা বৈচিত্র্য দেখা যায়। মূল ভূখণ্ডের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের পাশাপাশি প্রায় বারো লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিকও এতে ভোট দেওয়ার অধিকার রাখেন।
তবে দখলকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম এলাকার সাড়ে সাত লাখ বাসিন্দার মধ্যে কেবল ইহুদি বসতিস্থাপনকারীরাই ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। অন্যদিকে পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের নাগরিকত্ব না থাকায় তারা কেবল স্থানীয় কাউন্সিলে ভোট দিতে পারলেও জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না।
এছাড়া বিদেশে থাকা সাধারণ নাগরিকদের জন্য ভোটাধিকার সংরক্ষিত না থাকলেও কেবল কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূতেরা এর ব্যতিক্রম হিসেবে আগেই নিজেদের রায় জানিয়ে দিয়েছেন।
এবারের ভোটের প্রধান ইস্যুসমূহ : এবারের নির্বাচনে ভোটারদের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সংকট:
নিরাপত্তার বড় ফাঁকফোকর : বিগত বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া বড় ধরনের নিরাপত্তা ব্যর্থতার কোনো আনুষ্ঠানিক বিচার বিভাগীয় তদন্ত না হওয়ায় জনমনে জমে আছে তীব্র ক্ষোভ।
সামরিক সেবায় ছাড় বিতর্ক : অতি-কট্টর ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদানে সরকারের বিশেষ ছাড় দেওয়া নিয়ে সমাজের অন্য অংশের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।
বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা হরণ : বিচার বিভাগের ক্ষমতা সংকুচিত করার সরকারি উদ্যোগ দেশজুড়ে নজিরবিহীন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল, যা এখনো ভোটারদের বড় বিবেচ্য বিষয়।
যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অর্থনীতি :লেবানন ও ফিলিস্তিনে চলমান সংঘাতের কারণে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া প্রতিরক্ষা বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী করে তুলেছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সাত বছরে ষষ্ঠ ভোট : গত আটত্রিশ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো পার্লামেন্ট তার নির্ধারিত চার বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে চলেছে। তবে তা সত্ত্বেও ২০১৯ সালের পর থেকে এটি ইসরায়েলের ষষ্ঠ নির্বাচন।
বারবার ঝুলন্ত সংসদ ও জোটের ভাঙাগড়ার খেলায় দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। বিগত সরকারের মেয়াদকালে নানামুখী টানাপোড়েন শেষে গত জুলাইয়ে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়। এই নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাবেন পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
সান নিউজ / রাজীব
