শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিন মহানবমী উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ছিল ভক্তদের ব্যাপক সমাগম। দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তির পরাজয় এবং সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের বিজয় কামনায় প্রার্থনা করেন হাজারো ভক্ত। সকাল থেকেই ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ধর্মীয় আবহে মুখর হয়ে ওঠে।
দুর্গাপূজার মহানবমী দেবী দুর্গার শক্তি, সাহস ও বিজয়ের মহিমায় উজ্জ্বল একটি দিন। এদিন দেবী দুর্গার পূজা, অঞ্জলি ও চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে ভক্তরা জগজ্জননীর আরাধনা করেন। মহিষাসুরকে পরাজিত করে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গা ন্যায়, সত্য ও কল্যাণের প্রতীক হয়ে ওঠেন। মহানবমী তাই শুধু পূজার একটি দিন নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর জয়ের বার্তাও বহন করে। এদিন দেবীর কাছে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনা করেন ভক্তরা।
আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে মহানবমীর বিহিত পূজা শুরু হলে সেখানে ভক্তদের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়তে থাকে। পূজার আনুষ্ঠানিকতায় বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্য এবং ঘণ্টাধ্বনিতে সৃষ্টি হয় এক পবিত্র পরিবেশ। নারী, পুরুষ, শিশু ও প্রবীণসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ দেবীর চরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে মন্দিরে সমবেত হন।
পূজার নির্ধারিত পর্বে ভক্তদের মধ্যে ফুল ও বেলপাতা বিতরণ করা হয়। পরে তারা একযোগে অঞ্জলি প্রদান করে দেবীর আশীর্বাদ কামনা করেন। অনেককে দুই হাত জোড় করে গভীর ভক্তিভরে প্রার্থনা করতে দেখা যায়। কেউ আবার দেবীর উদ্দেশে জয়ধ্বনি দিয়ে উৎসবের আনন্দকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন।
মহানবমী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এদিন দেবী দুর্গার শক্তির পূর্ণ প্রকাশ ঘটে। তাই ভক্তরা নিজেদের ও পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধির পাশাপাশি দেশ, সমাজ এবং মানবজাতির কল্যাণ কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করেন। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা ও নানাবিধ সামাজিক সংকটের প্রেক্ষাপটে অনেকেই শান্তি, সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক সহনশীলতার পরিবেশ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রার্থনা করেন।
পূজার আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি মন্দির প্রাঙ্গণে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দেয় অস্থায়ী মেলা। নানা ধরনের দোকানে স্থান পায় গৃহস্থালির সামগ্রী, অলংকার, পোশাক, প্রসাধনী এবং শিশুদের খেলনা। পূজা শেষে অনেক পরিবারকে অবসর সময় কাটাতে মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখতে দেখা যায়। শিশুদের উচ্ছ্বাস এবং দর্শনার্থীদের ভিড়ে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতারা জানান, এবারের দুর্গোৎসবের শুরু থেকে প্রতিটি পর্ব শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মহালয়া থেকে শুরু করে ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী এবং মহানবমীর কর্মসূচিগুলোতে ভক্তদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। ধর্মীয় অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে উদযাপনের জন্য তারা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতার প্রশংসাও করেন।
পূজা আয়োজকদের মতে, দেবী দুর্গা কেবল ধর্মীয় উপাসনার প্রতীক নন, তিনি অন্যায়, হিংসা ও অশুভ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামেরও প্রতীক। তাই মহানবমীর প্রার্থনায় ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পায়। তারা আশা প্রকাশ করেন, দেশের সব ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করবেন।
আয়োজকরা আরও বলেন, দুর্গাপূজার মূল শিক্ষা হচ্ছে শুভ শক্তির বিজয় এবং অশুভ শক্তির পরাজয়। সমাজ থেকে বিদ্বেষ, সহিংসতা ও বিভেদ দূর করে ঐক্য ও মানবতার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হোক, সেটিই তাদের প্রত্যাশা। মহানবমীর এই প্রার্থনা শুধু ধর্মীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের আহ্বানও বহন করে।
এদিকে আগামীকাল বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের এ ধর্মীয় উৎসব। সেদিন প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। তবে বিদায়ের ক্ষণেও ভক্তদের বিশ্বাস, দেবীর আশীর্বাদ তাদের জীবনে শান্তি, মঙ্গল ও শক্তির বার্তা বয়ে আনবে। বিজয়ার আবেগঘন মুহূর্তে তাই আনন্দ ও বেদনার মিশেলে নতুন প্রত্যাশা নিয়েই দেবীকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন ভক্তরা।
সান নিউজ / রাজীব
