সাভারে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযানের নামে উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণ কম দেখিয়ে মামলা, সাধারন মানুষকে জোর করে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে অর্থ আদায়সহ প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের ছেড়ে দিয়ে প্রায় ৩৮ লাখ আদায়ের অভিযোগে উঠায় দুই কর্মকর্তাকে ক্লোজ করা হয়েছে। সোমবার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক সাইদুল ইসলাম। এর আগে সকালে অভিযুক্ত দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের প্রাথমিক তদন্ত শেষে তাদেরকে ক্লোজ করা হয়েছে।
ক্লোজ হওয়া দুই কর্মকর্তা হলেন, ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মতিউর রহমান এবং সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মেহেদী।
ডিবি পুলিশ ও বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই মাস ধরে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) মতিউর রহমান এবং সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মেহেদীর নের্তৃত্বে পরিচালিত দলটির বিরুদ্ধে মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযানের নামে শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়া ও ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক ব্যক্তিদের মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া, উদ্ধার করা মাদকের পরিমাণ কম দেখিয়ে মামলা দেওয়া এবং সাধারন মানুষকে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর মতো গুরুতর অপকর্মের মাধ্যমে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কোথাও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বা গাঁজা উদ্ধারের পর অর্থের বিনিময়ে আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও উদ্ধার করা মাদকের তুলনায় মামলায় কম পরিমাণ দেখানো হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আটক ব্যক্তির কাছে মাদক না পাওয়া সত্ত্বেও মাদক দিয়ে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে শাস্তির দাবি উঠেছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর মডেল হাইস্কুলের পেছনে এক নারীকে আটকের অভিযোগ ওঠে এসআই মতিউর ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে। ওই নারীর দাবি, নিশ্চিন্তপুরের বুড়িপাড়া এলাকায় একটি ঝালমুড়ির দোকানের সামনে থেকে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে রিকশায় তুলে নরসিংহপুর বাসস্ট্যান্ডে নেওয়া হয়। পরে ডিবির একটি মাইক্রোবাসে তুলে তাঁর হাতে জোর করে হেরোইন দিয়ে ছবি তোলা হয়।
ওই নারীর ভাষ্য, তিনি হেরোইন হাত থেকে ফেলে দিলে এক নারী কনস্টেবল তাঁকে মারধর করেন। পরে হেরোইন দিয়ে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গালিগালাজ ও মারধরের একপর্যায়ে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাঁকে সাভার বাসস্ট্যান্ডে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এছাড়া টাকা নেওয়ার পর তাঁকে আগামী তিন বছর নির্বিঘেœ মাদক ব্যবসা চালানোর সুযোগ দেওয়ার আশ্বাসের পাশাপাশি ঘটনার দিন থেকে অন্তত তিন দিন ওই নারীকে এলাকার বাইরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ঘটনাস্থলের এক ঝালমুড়ি বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁর সামনে থেকেই ওই নারীকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে তিনি ওই নারীর কাছ থেকে কোনো মাদক উদ্ধার করতে দেখেননি। ওই নারী মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কি না, তিনি তা জানেন না বলে জানান।
গত ৩০ আগস্ট আশুলিয়ার কাইচাবাড়ি এলাকা থেকে জাফর ও নাছিমা নামে দুজনকে এক হাজার পিস ইয়াবা ও চার কেজি গাঁজাসহ আটকের অভিযোগ রয়েছে ডিবির ওই দলের বিরুদ্ধে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, নাছিমাকে সাত লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। ডিবি কার্যালয়ের কাছাকাছি সুমন নামের এক ব্যক্তির বিকাশের দোকানের মাধ্যমে ওই টাকা আদায় করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি নাছিমা ময়মনসিংহে ২০০ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন বলেও সূত্রটি দাবি করেছে।
অন্যদিকে, জাফরের কাছ থেকে ৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা নিয়ে চার কেজি গাঁজার পরিবর্তে মাত্র আধা কেজি গাঁজা উদ্ধারের মামলা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্রের দাবি, এর মধ্যে চার লাখ টাকা হেমায়েতপুরের ব্র্যাক ব্যাংকের একটি এটিএম বুথ থেকে তোলা হয়। বাকি ৫৫ হাজার টাকা জাফরের স্ত্রীর বিকাশ নম্বর থেকে সুমনের দোকানের বিকাশ নম্বরে পাঠানো হয়। এর আগেও আশুলিয়ার ভাদাইল এলাকার শমসের প্লাজার সামনে থেকে ২০০ পিস ইয়াবাসহ জাফরকে আটকের পর সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সাভারের আমিনবাজার, কাউন্দিয়া ও মজিদপুর এলাকাতেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর আমিনবাজারের বরদেশী এলাকা থেকে ‘হাতকাটা’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তিকে ৫০০ পিস ইয়াবাসহ আটকের পর ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে মাত্র ৫০ পিস ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে গত ৭ আগস্ট আমিনবাজার এলাকায় জাহি ও তাঁর ছেলে আগুনকে ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ আটকের পরে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে তাঁদের বিরুদ্ধে যথাক্রমে ১০ ও ৯০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের মামলা দেওয়া হয়। স্থানীয় এক হোটেল মালিক ও এক মেম্বারের মধ্যস্থতায় অর্থের লেনদেন মীমাংসা করা হয়। এ ছাড়া গত ৮ সেপ্টেম্বর আমিনবাজারের বরদেশী এলাকায় পুলিশ সদস্য হত্যার দুই দিন পর কাউন্দিয়া এলাকায় সোর্স সোহেলের মাধ্যমে এক মাদক কারবারির বাবা ও মাকে ১০০ পিস ইয়াবাসহ আটকের পর ৩ লাখ ৪ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গত ৪ আগস্ট সাভারের মজিদপুরে জাহাঙ্গীর ও তাঁর ভাইকে ৩৫০ পিস ইয়াবাসহ আটকের পর ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে এসআই মতিউর ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে।
আশুলিয়ার শ্রীপুরের সুবন্ধী এলাকায় সুলতান নামের এক মাদক কারবারির স্ত্রী ও ছেলেকে ২৫ গ্রাম হেরোইনসহ আটকের পর দুই লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একইভাবে ভাদাইল এলাকায় সুজনকে ৫০০ পিস ইয়াবাসহ আটকের পর পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। এ সময় সুজনের সঙ্গে আটক নাজমুল ও আনোয়ারকেও অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাভারের বলিয়য়পুর এলাকাতেও এক যুবককে ৯০ পিস ইয়াবা দিয়ে মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে এসআই মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে। ওই যুবকের পরিবারের দাবি, এক প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে তাঁদের ছেলের এক বন্ধুর সম্পর্ক ছিল। পরে ওই বন্ধু নারীকে নিয়ে চলে গেলে তাঁদের খুঁজে না পেয়ে ওই যুবককে আটক করে তাঁর কাছে ৯০ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়।
পরিবারের লোকজনের অভিযোগ, ওই যুবককে আটকের সময় ঘটনাস্থলে অনেক লোক জড়ো হয়েছিলেন কিন্তু তখন তাঁর কাছে কোনো ইয়াবা বা অন্য মাদক দেখা যায়নি। পরে তাঁর বিরুদ্ধে ইয়াবা উদ্ধারের অভিযোগ আনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিবারটি। এ ঘটনায় ওই প্রবাসীর কাছ থেকে ডিবির দলটি আর্থিক সুবিধা নিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এএসআই মেহেদী ঢাকা জেলা উত্তর ডিবিতে টানা প্রায় চার বছর ধরে কর্মরত। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুবাদে এলাকায় তাঁর শক্তিশালী সোর্স নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে এবং ওই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারিদের আটক এবং পরে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
ডিবি পুলিশের এক সদস্য নাম শ্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, এসআই মতিউর ও এএসআই মেহেদীর কর্মকান্ড নিয়ে বাহিনীর ভেতরেও অসন্তোষ রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, তাঁরা কখনো কখনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে অভিযানে বের হন। কোনো অভিযোগ উঠলে আর্থিক সুবিধার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবির এসআই মতিউর রহমান বলেন, এগুলো তো মিথ্যা মামলা। মাদক বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে সরাসরি দেখা করে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
ঢাকা জেলা উত্তর ডিবির অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইদুল ইসলাম বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তাঁর জানা আছে এবং তিনি নিজেই তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছেন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এছাড়া এসআই মতিউর রহমান ও এএসআই মেহেদীকে ক্লোজ করার বিষয়টিও নিশ্চিত করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
সাননিউজ/বান্না
