যুদ্ধক্ষেত্রের নৃশংসতা অনেক সময় মানুষের ভেতরের নৈতিকতাকে এমনভাবে নাড়িয়ে দেয় যে চরম পরিণতির জন্ম হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের চার বছর পার হওয়ার মুখে তেমনই এক চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন ঘটনা সামনে এসেছে। নিজ দেশের সঙ্গেই চূড়ান্ত অবিশ্বাসের পথ বেছে নিয়েছেন ২৬ বছর বয়সী এক রুশ লেফট্যানেন্ট।
পুতিন বাহিনীর অত্যন্ত সংবেদনশীল রণকৌশল, বাঙ্কারের মানচিত্র এবং গোপন তথ্য কিয়েভের গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দেওয়ার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, তাঁর এই অন্তর্ঘাতী কার্যকলাপের জেরে প্রাণ হারিয়েছেন তিন শতাধিক রুশ সেনা। বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ঘটনা ক্রেমলিনের অন্দরমহলে বড় ধরনের কম্পন সৃষ্টি করেছে।
তদন্তে জানা গেছে, স্তুপনিকভের এই রাষ্ট্রদ্রোহের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক ছিলেন তার নিজের মা তাতিয়ানা ইয়ান্টসেন। অতীতে পুতিন সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক রাজনৈতিক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তাতিয়ানার আদর্শ ও সাহচর্যই তরুণ অফিসারকে কিয়েভের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মায়ের মাধ্যমেই প্রথম ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দাদের গোপন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এই রুশ লেফট্যানেন্ট।
ডনবাসের রণক্ষেত্র থেকে কিয়েভের দিকে গোপন পথ
অভিযুক্ত ওই তরুণের নাম লেভ স্তুপনিকভ। ইউক্রেনের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ডনবাস অঞ্চলের একটি বিশেষ ঘাঁটির প্রধান অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাকে। রুশ কমান্ডারদের সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধ ইউনিটের সংযোগ রক্ষা করা এবং আকাশ থেকে নজরদারি চালানো ড্রোন ও ক্যামেরার লাইভ ফিড নিখুঁতভাবে পৌঁছে দেওয়ার মূল কাজটি ছিল তার ওপরই।
কিন্তু যুদ্ধের ভয়াবহতা ও পুতিন প্রশাসনের আগ্রাসী নীতি মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে দিয়েছিল স্তুপনিকভকে। দীর্ঘদিন ধরে রুশ বিরোধী বিভিন্ন ভিডিও এবং যুদ্ধবন্দিদের সাক্ষাৎকার দেখতে দেখতে লেভের মনে ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা দানা বাঁধতে শুরু করে।
পেটে ব্যথার নিখুঁত নাটক ও মিসাইল হামলার বিভীষিকা
ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের সঙ্গে হাত মেলানোর পর থেকেই রুশ বাহিনীর প্রতিটি পদক্ষেপের গোপন তথ্য কিয়েভে পাচার করতে শুরু করেন স্তুপনিকভ। তদন্তে উঠে এসেছে এক শিহরণ জাগানো তথ্য। ঘটনার দিন সকালে হঠাৎ করেই পেটে তীব্র ব্যথার নিখুঁত অভিনয় করে সহযোদ্ধাদের থেকে কিছুটা দূরে সরে যান তিনি। এরপর মুহূর্তের মধ্যে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে নিখুঁত লোকেশন বা কোঅর্ডিনেট পাঠিয়ে দেন।
ঠিক সেই মুহূর্তেই স্তুপনিকভের দেওয়া ঠিকানায় আছড়ে পড়ে ইউক্রেনের সুনির্দিষ্ট মিসাইল। ওই আকস্মিক হামলায় একজন কর্নেলসহ ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয় ৬৮ জন রুশ সেনার, আর আহত হন আরও প্রায় ৬০ জন। হামলার পরপরই ইউক্রেনীয় গোয়েন্দারা বার্তা পাঠিয়ে জানতে চেয়েছিল বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে কি না।
জবাবে স্তুপনিকভ যে ঠান্ডা মাথার বার্তা পাঠান, তা শুনলে যে কারও শিউরে উঠতে হয়—তিনি লিখেছিলেন, ঘাঁটিতে ‘কেবল মাংসের স্তূপ পড়ে আছে’।
রুশ বাহিনীর অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা ছায়াবৃক্ষ নেটওয়ার্ক
গোয়েন্দা সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, স্তুপনিকভ একা নন; সাধারণ গৃহবধূ থেকে শুরু করে খোদ রুশ সামরিক বাহিনীর বহু সদস্য অত্যন্ত সুরক্ষিত এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কিয়েভের এজেন্টদের সঙ্গে নিয়মিত তথ্য বিনিময় করে চলেছেন। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে রুশ সেনাদের জন্য আর্থিক পুরস্কার ও সুরক্ষার ঘোষণা দেওয়ার পর এই আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে।
অবশেষে সব পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের এক অন্ধকার রাতে নিজের ইউনিট ফাঁকি দিয়ে সম্পূর্ণ নিরাপদে ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে পাড়ি জমান স্তুপনিকভ। যুদ্ধের ময়দানে নিজ দেশের বিরুদ্ধেই এমন সুপরিকল্পিত বিশ্বাসঘাতকতা আধুনিক সামরিক ইতিহাসের পাতায় এক গভীর ক্ষত হয়ে থাকবে।
সান নিউজ / রাজীব
