ইউরোপের একাধিক দেশে শিক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং লাগামহীন আবাসন সংকটের বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন শুরু হয়েছে। স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল, ইতালি এবং আলবেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশের রাজপথে নেমে এসেছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার ফলে সৃষ্ট এই পরিস্থিতি পুরো ইউরোপজুড়ে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে।
ফরাসি শিক্ষাঙ্গন ও জীবনযাত্রায় তীব্র অসন্তোষ : ফ্রান্সে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শিক্ষকস্বল্পতা, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জটিল নীতির বিরুদ্ধে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিক বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতির কারণে বহু শিক্ষার্থী নিয়মিত শিক্ষাদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
শিক্ষাঙ্গনের এই সংকটের পাশাপাশি নিত্যপণ্যের চড়া দাম এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষকেও আন্দোলনে নামতে বাধ্য করেছে। হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে।
দেশের অন্যতম প্রধান শ্রমিক সংগঠন ‘জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার’ (সিজিটি) এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং পেনশন বাড়ানোর জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ফরাসি সরকার ৩ হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধন ফি বাড়ানোর বিতর্কিত পরিকল্পনা বাতিলের ঘোষণা দিলেও বিক্ষোভ পুরোপুরি থামেনি। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁর মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এই আন্দোলন সরকারের ওপর ব্যাপক রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
আবাসন সংকটের কবলে স্পেন ও পর্তুগাল : স্পেনে আবাসন ও বাড়িভাড়ার মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ক্ষোভ চরম রূপ ধারণ করেছে। একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এক বৃদ্ধার বাড়িভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়ায় তাঁকে উচ্ছেদ হতে হয় এবং পরবর্তীতে মর্মান্তিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র গণবিক্ষোভ শুরু হয়। ভাড়া কমানো এবং বিনিয়োগ তহবিলগুলোর আবাসন ক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির দাবিতে মানুষ রাজপথে নামেন। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষায় একটি জরুরি আইন পাসের চেষ্টা চালালেও রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে তা আটকে যায়। ফলশ্রুতিতে, আগামী ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
পর্তুগালেও একই চিত্র দেখা গেছে। লিসবনের কেন্দ্রস্থলে শত শত বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে আবাসন সংকট নিরসনের দাবি জানান। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে আবাসনের দাম ১২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় হারের প্রায় দ্বিগুণ।
ইতালি ও আলবেনিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি : ইতালির মিলান শহরেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও সীমিত আয়ের মানুষের সংকটকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শুরুর দিকে শান্তিপূর্ণ থাকলেও শেষের দিকে কিছু স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রী এডি রামার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং শিক্ষার মান অবনতির অভিযোগে টানা বিক্ষোভ চলছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থিত একটি বিলাসবহুল উপকূলীয় আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বহুমুখী রূপ ধারণ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভের স্থায়িত্ব পুরোপুরি নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর কার্যকর নীতি প্রণয়ন এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর। স্পেন বা ফ্রান্সের মতো দেশগুলোতে আগাম নির্বাচন এবং সরকারি সংস্কারমূলক উদ্যোগ পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। তবে ইউরোপজুড়ে তরুণ প্রজন্মের এই অসন্তোষ আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী সমীকরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।
সান নিউজ / রাজীব
