প্রচণ্ড গরম ও তীব্র রোদে সুস্থ থাকা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে জনজীবনে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত গরমে শরীরে পানিশূন্যতা, হিট এক্সহস্টশন এমনকি হিটস্ট্রোকের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তবে কিছু সতর্কতা ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস মেনে চললে সহজেই গরমের বিরূপ প্রভাব থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
গরমে শরীর ঘামের মাধ্যমে প্রচুর পানি হারায়। ফলে দেখা দিতে পারে পানিশূন্যতা, দুর্বলতা ও মাথা ঘোরার মতো সমস্যা। তাই তৃষ্ণা পাওয়ার অপেক্ষা না করে নিয়মিত পানি পান করা জরুরি। বাইরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে সঙ্গে পানির বোতল রাখুন। অতিরিক্ত ঘাম হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওরস্যালাইন বা উপযুক্ত ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয় গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলাই ভালো।
প্রখর রোদ এড়িয়ে চলুন
সাধারণত দিনের মধ্যভাগে, বিশেষ করে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত গরমের তীব্রতা বেশি অনুভূত হতে পারে। এ সময় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলুন। বাইরে যেতে হলে ছায়াযুক্ত পথ ব্যবহার করুন এবং সম্ভব হলে কাজের সময় সকাল বা বিকেলের দিকে নির্ধারণ করুন।
পোশাক নির্বাচনে সতর্ক থাকুন
গরমে হালকা রঙের, ঢিলেঢালা ও বাতাস চলাচল করতে পারে এমন পোশাক পরুন। সুতি বা ঘাম শোষণকারী কাপড় শরীরকে তুলনামূলক আরামদায়ক রাখতে সাহায্য করে। বাইরে বের হওয়ার সময় টুপি বা ক্যাপ ব্যবহার করুন, যাতে মাথা ও মুখ সরাসরি রোদ থেকে কিছুটা সুরক্ষা পায়।
ছাতা, সানগ্লাস ও সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন
প্রচণ্ড রোদে বাইরে গেলে ছাতা ব্যবহার করলে সরাসরি সূর্যালোকের সংস্পর্শ কমে। পাশাপাশি অতিবেগুনি রশ্মি থেকে চোখকে সুরক্ষিত রাখতে ইউভি-প্রটেকশনযুক্ত সানগ্লাস ব্যবহার করতে পারেন। ত্বকের সুরক্ষায় এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি মাত্রার ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহার করা ভালো। বাইরে যাওয়ার আগে এটি লাগান এবং নির্দেশনা অনুযায়ী পুনরায় ব্যবহার করুন।
খাদ্যতালিকায় রাখুন হালকা ও পানিসমৃদ্ধ খাবার
গরমের সময় সহজপাচ্য খাবার খাওয়া ভালো। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ডাল, মৌসুমি ফল ও পানিসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। তরমুজ, শসা, পেঁপে ও কমলাজাতীয় ফল শরীরে পানি সরবরাহে সহায়তা করে। অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার খেলে অস্বস্তি হতে পারে, তাই পরিমিত খাবার গ্রহণ করুন। পাশাপাশি খাবার পরিষ্কার ও নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করাও জরুরি।
অতিরিক্ত পরিশ্রম থেকে বিরত থাকুন
তীব্র গরমে ভারী কাজ বা কঠোর ব্যায়াম করলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। বাইরে কাজ করতে হলে নিয়মিত বিরতি নিন, ছায়ায় বিশ্রাম করুন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন। মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, বমি ভাব বা পেশিতে টান ধরলে কাজ বন্ধ করে ঠান্ডা জায়গায় চলে যান।
পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন
গরমে অতিরিক্ত ঘামের কারণে ত্বকে অস্বস্তি ও ঘামাচির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই নিয়মিত গোসল করুন, পরিষ্কার ও শুকনো পোশাক পরুন এবং ঘামে ভেজা কাপড় দ্রুত পরিবর্তন করুন। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি খাবার ও পানির নিরাপত্তার দিকেও খেয়াল রাখুন।
ঘর রাখুন যতটা সম্ভব ঠান্ডা
দিনের বেলায় জানালার পর্দা টেনে সরাসরি রোদ প্রবেশ কমান। ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন এবং সম্ভব হলে ফ্যান বা শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করুন। তবে অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্র পরিবেশে শুধু ফ্যানের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নাও হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শীতল স্থানে অবস্থান করা জরুরি।
শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিন
শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা মানুষ গরমের কারণে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। তাদের নিয়মিত পানি পান করতে উৎসাহিত করুন, রোদে যাওয়া সীমিত রাখুন এবং ঠান্ডা পরিবেশে থাকার ব্যবস্থা করুন। শিশু বা বয়স্কদের শরীরে অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন।
হিটস্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন
অতিরিক্ত গরমে বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক আচরণ, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা শরীরের তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে যাওয়া হিটস্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এটি একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত অবস্থা। এমন লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিন। আক্রান্ত ব্যক্তিকে ঠান্ডা জায়গায় নিয়ে গিয়ে ভেজা কাপড়, ঠান্ডা পানি বা অন্যান্য উপযুক্ত পদ্ধতিতে দ্রুত শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা করুন। ব্যক্তি অচেতন বা বিভ্রান্ত থাকলে মুখে পানি বা অন্য কোনো পানীয় দেবেন না।
প্রচণ্ড গরমে সুস্থ থাকতে খুব জটিল কোনো পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই। পর্যাপ্ত পানি পান, রোদ এড়িয়ে চলা, উপযুক্ত পোশাক পরা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং শরীরের সংকেত সম্পর্কে সচেতন থাকাই হতে পারে বড় সুরক্ষা। নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের প্রতিও যত্নশীল হোন। সামান্য সচেতনতা ও নিয়ম মেনে চলার মাধ্যমে গরমের দিনগুলোতেও সুস্থ ও নিরাপদ থাকা সম্ভব।
সান নিউজ/ রাব্বি
