সৌদি আরবের সঙ্গে গভীর আর্থিক নির্ভরতা এবং কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তির জেরে এক জটিল কূটনৈতিক ও সামরিক সংকটের মুখে পড়েছে পাকিস্তান। ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করায় এবং সৌদি ভূখণ্ডে হামলা বাড়ায় রিয়াদের নিরাপত্তায় ইসলামাবাদকে সহায়তা করার চাপ দিন দিন বাড়ছ। তবে সরাসরি কোনো বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে দেশের ভেতরে রয়েছে ব্যাপক রাজনৈতিক ও জনগত আপত্তি।
আর্থিক মারপ্যাঁচ ও যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি : পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে সৌদি আরবের ভূমিকা অত্যন্ত গভীর। গত এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের তিন বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ঘাটতি মেটাতে জরুরি সহায়তা দেয় রিয়াদ। এছাড়া পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা পাঁচ বিলিয়ন ডলারের আমানতের মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়ানো হয়েছে, যা দেশটির মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় ৩৮ শতাংশ।
পাশাপাশি, গত বছর সৌদি আরবে কর্মরত পাকিস্তানি প্রবাসীদের পাঠানো প্রায় দশ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। এই বিপুল আর্থিক ও বাণিজ্যিক নির্ভরতার ফলেই রিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা পাকিস্তানের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই নির্ভরতার পথ ধরে গত আগস্টে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কার্যকারিতা নবায়ন করে পাকিস্তান, যেখানে পরবর্তীতে তুরস্কও যুক্ত হয়। সম্প্রতি সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং এর সংলগ্ন এলাকায় হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হতাহতের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ দেশটির নিরাপত্তায় পাকিস্তানের সমর্থন আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, সৌদি আরব এবং পবিত্র মক্কা ও মদিনার সুরক্ষায় সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী।
ইরান ও ইয়েমেনের জটিল সমীকরণ : তবে এই সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি পাকিস্তানকে এক বড় বিপাকে ফেলেছে। সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে এই প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ এবং তেল স্থাপনাগুলোকে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা থেকে রক্ষা করা।
কিন্তু হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করতে ইরানকে রাজি করানোর পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তেহরান ও ইসলামাবাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে ইরান ও ইয়েমেন ইস্যুতে পাকিস্তান ও ইরান এখন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে।
তাছাড়া, অতীতে ২০১৫ সালেও রিয়াদ ইয়েমেন যুদ্ধে সামরিক সহায়তার অনুরোধ জানালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সরকার তা নাকচ করে দিয়েছিল এবং সংসদ নিরপেক্ষ থাকার পক্ষে প্রস্তাব পাস করেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বেশ আলাদা।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরকারের রাজনৈতিক ভিত্তি কিছুটা দুর্বল এবং তারা মূলত সামরিক বাহিনীর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সৌদি সহায়তার অনুরোধ নিয়ে এবার সংসদে আগের মতো প্রকাশ্য ও দীর্ঘ বিতর্কের সুযোগ সীমিত।
জনগণের অনীহা ও কঠিন ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য : সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানোর আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও ইয়েমেনের সংঘাতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা রয়েছে পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের মধ্যে। দেশটির একটি বড় অংশের মানুষের ইরানের প্রতি জোরালো সহানুভূতি রয়েছে।
বিশেষ করে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মনে প্রভাব ফেলে। অতীতে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর দেশটিতে হওয়া ব্যাপক শোকমিছিল তারই প্রমাণ।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের পক্ষে যুদ্ধে জড়ালে পাকিস্তান প্রচ্ছন্নভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এবং ইরানের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যা দেশে তীব্র জনঅসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে সাড়ে ছয় লাখের বেশি সদস্য, চার শতাধিক যুদ্ধবিমান এবং নিজস্ব ড্রোন প্রযুক্তি রয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশের ভেতরে সীমান্ত বিদ্রোহ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সামলানোর বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি রক্ষা করা এবং ইয়েমেনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা—এই দুইয়ের মাঝে চরম এক সংকটের মধ্য দিয়ে এগোতে হচ্ছে পাকিস্তানকে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের যে কূটনৈতিক অবস্থান পাকিস্তান তৈরি করেছিল, এই সামরিক জড়িয়ে পড়ার কারণে তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সান নিউজ / রাজীব
