জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরও প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে দাবি করেছে ‘অল্টারনেটিভস’। সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জুলাই গণহত্যার বিচার, জ্বালানি সার্বভৌমত্ব, শ্রম ও শিক্ষা খাতের সংস্কার এবং পরিবেশ সুরক্ষাসহ ৯ দফা দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের ভাষ্য, সরকারের পরিবর্তন হলেও ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা’ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। বরং ভিন্ন রূপে তা আবার ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ‘দেশের অবস্থা’ শীর্ষক এক প্রেস মিটে এসব দাবি তুলে ধরে অল্টারনেটিভস। সংগঠনটির জাতীয় সাংগঠনিক কমিটির পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের সাহসী আন্দোলনের পরও প্রত্যাশিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হয়নি। এ পরিস্থিতিতে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ, সংগঠিত হওয়া ও প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়।
প্রেস মিটে অল্টারনেটিভসের ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্য উপদেষ্টা ও সংগঠনটির সংগঠক মাহফুজ আলম।
অল্টারনেটিভসের ৯ দফা দাবিগুলো হলো—
প্রথমত, রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে ধনী-গরিবের বৈষম্য কমানো। পাশাপাশি অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তৃতীয়ত, মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন ও এসআরবি আইন কার্যকরের ক্ষেত্রে মানবাধিকার সুরক্ষা, নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
চতুর্থত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনের পাশাপাশি কুইক রেন্টাল এবং অসম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চুক্তির সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি করা হয়েছে। আমদানি, অলিগার্ক ও বিদেশি কোম্পানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
পঞ্চমত, ‘স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা অধ্যাদেশ–২০২৫’ এবং ‘রোগী সুরক্ষা ও প্রতিকার অধ্যাদেশ–২০২৫’ আইন হিসেবে প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা, মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং ভারসাম্যপূর্ণ ওষুধনীতি প্রণয়নের দাবি রয়েছে।
ষষ্ঠত, নারী কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং যৌন নিপীড়ন ও শিশু নিপীড়ন প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ভিন্নমত ও বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ’ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সপ্তমত, শ্রম কমিশনের সুপারিশ এবং শ্রম আইন ২০২৬ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে। বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর মাধ্যমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনঃকর্মসংস্থান এবং সার সংকট নিরসনের দাবি রয়েছে। কৃষকদের ক্যান্সারসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। সরকারি পাটকল, চিনিকলসহ অন্যান্য কলকারখানা বেসরকারি খাতে দেওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
অষ্টমত, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন এবং ছাত্র ও যুবসমাজের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তাদের পৃষ্ঠপোষকতার দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সব ক্ষেত্রে দলীয় পক্ষপাতমুক্ত ও স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা এবং বেসরকারি খাতে নিরাপদ ও জেন্ডার-সংবেদনশীল কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও চাকরির সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
আমার বাঙলা/ রাব্বি
নবমত, প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসকারী সব উন্নয়ন প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছে অল্টারনেটিভস। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন ও জলবায়ু সহনশীল প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বন্যা, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, এসব দাবি বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য নিশ্চিত করা সম্ভব। এর মধ্য দিয়েই একটি কার্যকর, গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমুখী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাওয়া যাবে।
