বাংলাদেশে চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলো নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় এনেছে। ১২ জানুয়ারি থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাজার, পরিবহন, নির্মাণ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতে চাঁদা দাবির অভিযোগ সামনে এসেছে।
কোনো ঘটনায় চাঁদা দাবির অভিযোগে মামলা হয়েছে, কোথাও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আবার কিছু ঘটনায় অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে হামলা, ভাঙচুর কিংবা গুলি চালানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে সংবাদে প্রকাশিত অভিযোগ এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। ফলে প্রতিটি ঘটনাকে সংশ্লিষ্ট তদন্ত, মামলা ও বিচারিক ফলাফলের আলোকে দেখা জরুরি।
জানুয়ারির শেষ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামনে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাদের মধ্যে এ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়।
ডাকসুর পক্ষ থেকে কিছু ভিডিও ও স্ক্রিনশটকে অভিযোগের সমর্থনে উপস্থাপন করা হয়। বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠনের খবরও প্রকাশিত হয়।
ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি কারখানাকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবির অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ ছিল, চাঁদা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও পণ্য লুটের ঘটনা ঘটে।
তবে অভিযুক্ত পক্ষ চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করে, কারখানার দূষণকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরেই ঘটনাটি ঘটেছে। তাই ঘটনাটিকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত চাঁদাবাজি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
মার্চে রাজধানীর ঘাট, বাস টার্মিনাল, বাজার, ফুটপাত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠে আসে।
বিভিন্ন সংগঠন, সমিতি কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও এতে উঠে আসে। এটি কোনো একক ঘটনার হিসাব নয়; বরং রাজধানীর একাধিক এলাকার পরিস্থিতি নিয়ে করা অনুসন্ধান।
চাঁদাবাজির অভিযোগ মোকাবিলায় মার্চে হটলাইন চালুর উদ্যোগের খবরও প্রকাশিত হয়। এটি কোনো নির্দিষ্ট চাঁদাবাজির ঘটনা নয়; বরং অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিরোধে প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপের অংশ।
এপ্রিল মাসে কিডনি চিকিৎসক কামরুল ইসলামের হাসপাতালকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা হয়।
মামলার প্রধান আসামি মো. মঈন উদ্দিনসহ তিনজনকে ১৪ এপ্রিল আদালত তিন দিনের রিমান্ডে পাঠানোর খবর প্রকাশিত হয়।
রাজধানীর মিরপুরে চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নামও উঠে আসে।
প্রতিবেদনে পল্লবীর একটি আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কাছে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গুলি চালানোর ঘটনাও সেখানে উল্লেখ করা হয়।
মে ও জুনে খুলনায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান জোরদারের খবর পাওয়া যায়।
বিভিন্ন অভিযানে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু অপরাধী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ জড়িত ছিল।
৮ জুন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে নিজেদের র্যাব সদস্য পরিচয় দিয়ে মাছের আড়তের শ্রমিকদের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে ভয় দেখিয়ে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। তাদের কাছে ওয়াকিটকি থাকার কথাও জানানো হয়।
একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩ হাজার স্পট থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের দাবি করা হয়।
১৮ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে একজন জনপ্রতিনিধির বক্তব্যের বরাত দিয়ে কারওয়ান বাজারে প্রতিদিন ২ থেকে ৩ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করা হয়।
একই বক্তব্যে পাইকারি মুরগির দোকানগুলো থেকে মাসে প্রায় ৬০ লাখ টাকা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়।
জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, রাজধানীতে প্রায় ১ হাজার ২০০ ব্যক্তির চাঁদাবাজির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ আদায়ের অভিযোগের বিষয়টি এতে উঠে আসে।
১৮ জুলাই মতিঝিলে চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে গুলি চালানোর অভিযোগ সামনে আসে। ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে দুই আসামিকে রিমান্ডে পাঠানো হয়।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তদের কাছ থেকে বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্র উদ্ধারের কথাও জানানো হয়।
জুলাইয়ে ময়মনসিংহে মধ্যরাতে চাঁদাবাজির অভিযোগে একজনকে হাতেনাতে আটকের খবর প্রকাশিত হয়। স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদা দাবির অভিযোগের ক্ষেত্রেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার বিষয়টি এ ঘটনায় সামনে আসে।
জুলাইয়ের শেষদিকে চট্টগ্রামে একটি ভবন নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দাবিকৃত অর্থ না দেওয়ায় নির্মাণস্থলে ভাঙচুর এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এর ফলে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়।
জুলাইয়ে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদা দাবি এবং অর্থ না দিলে গুলি করার হুমকির অভিযোগ উঠে আসে।
১৫ জুলাই বরিশালে ভ্রমণের সময় একজন বিচারক চাঁদাবাজির একটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়। পরে তিনি পুলিশকে মামলা করার নির্দেশ দেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
চাঁদা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটের অভিযোগে জুলাইয়ে আটজনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়।
এ ঘটনায় চাঁদা দাবির সঙ্গে হামলা, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অভিযোগও সামনে আসে।
১২ জানুয়ারি থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদগুলো পর্যালোচনা করলে কয়েকটি খাত বিশেষভাবে সামনে আসে।
কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঘাট, বাস টার্মিনাল এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট সংগঠনের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগও সংবাদে এসেছে।
ভবন নির্মাণ ও আবাসন প্রকল্পে বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং অর্থ না দিলে হামলা বা ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কিছু ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার ও চাঁদা দাবির অভিযোগ এসেছে।
কয়েকটি ঘটনায় চাঁদা দাবির সঙ্গে গুলি, অস্ত্র প্রদর্শন, হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ যুক্ত হয়েছে।
১২ জানুয়ারি থেকে ১২ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ কোনো একটি এলাকা বা নির্দিষ্ট পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
রাজধানীর বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পরিবহন, নির্মাণ ও আবাসন খাত—বিভিন্ন জায়গায় অর্থ দাবির অভিযোগ সামনে এসেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা শহরেও একই ধরনের অভিযোগে মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা অভিযান চালানোর খবর প্রকাশিত হয়েছে।
২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলো চাঁদাবাজির অভিযোগের বিস্তৃতি ও ধরন সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে, কিন্তু এগুলোকে দেশের মোট চাঁদাবাজির সরকারি হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছেনা।
