কথা বলতে বলতে হঠাৎ খুব পরিচিত কোনো শব্দ, নাম বা ব্যক্তির নাম মনে না পড়ার অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। কিছুক্ষণ পর আবার সেই শব্দটি মনে পড়ে যায়। পরিচিত কোনো কথা মনে থাকলেও ঠিক সময়ে মুখে না আসার এই ঘটনাকে বলা হয় ‘টিপ-অফ-দ্য-টাং’ ।
সাধারণত এ ধরনের ঘটনা সাময়িক এবং এতে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে সমস্যা যদি ঘন ঘন হতে থাকে, ক্রমশ বাড়ে কিংবা দৈনন্দিন কথাবার্তা ও কাজকর্মে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কেন এমন হয়?
কোনো শব্দ বা নাম মনে করার সময় মস্তিষ্কের স্মৃতি ও ভাষা-সম্পর্কিত বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে কাজ করে। তথ্যটি স্মৃতিতে থাকা সত্ত্বেও সেটি খুঁজে বের করে ভাষায় প্রকাশ করার প্রক্রিয়ায় সাময়িক সমস্যা হলে পরিচিত শব্দটি মুখে আসতে চায় না।
এ সময় অনেক ক্ষেত্রে শব্দটির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তি, জায়গা, ঘটনা বা চেহারা মনে থাকে, কিন্তু নামটি মনে পড়ে না। অর্থাৎ শব্দটি মস্তিষ্ক থেকে পুরোপুরি মুছে যায় না; বরং সেটি পুনরুদ্ধার ও ভাষায় প্রকাশের প্রক্রিয়ায় সাময়িক বাধা তৈরি হয়।
সব ভুলে যাওয়াই কি স্মৃতিনাশ?
না। মাঝেমধ্যে নাম বা শব্দ মনে না পড়লেই ডিমেনশিয়া হয়েছে—এমনটা ভাবার কারণ নেই। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ক্লান্তি কিংবা একই সময়ে একাধিক বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার কারণেও এ ধরনের সমস্যা হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঝেমধ্যে শব্দ খুঁজে পেতে কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে।
তবে ভুলে যাওয়ার ঘটনা যদি নিয়মিত হতে থাকে বা ক্রমশ বাড়তে থাকে, তখন কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।
কখন সতর্ক হবেন?
শুধু একটি শব্দ মাঝে মধ্যে মনে না পড়া সাধারণত উদ্বেগের কারণ নয়। কিন্তু এর সঙ্গে যদি আরও কিছু স্মৃতি বা চিন্তাভাবনার পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে—
* পরিচিত মানুষকে চিনতে সমস্যা হওয়া
* একই কথা বারবার বলা বা একই প্রশ্ন করা
* সাম্প্রতিক ঘটনা মনে রাখতে অসুবিধা হওয়া
* পরিচিত জায়গায় পথ হারিয়ে ফেলা
* দৈনন্দিন কাজ করতে সমস্যা হওয়া
* কথা বলার সময় নিয়মিত পরিচিত শব্দ খুঁজে না পাওয়া
* সমস্যাটি সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকা
এসব লক্ষণ থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। এগুলো কখনও কখনও ডিমেনশিয়া বা অন্যান্য স্নায়বিক সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
অন্য কোন কারণেও হতে পারে?
স্মৃতি ও শব্দ মনে করার সমস্যার পেছনে শুধু বয়স বা ডিমেনশিয়াই দায়ী নয়। ভিটামিন বি-১২-এর ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা, অবসাদ, উদ্বেগ, শ্রবণশক্তির সমস্যা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
এ ছাড়া গুরুতর মাথায় আঘাত, দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত মদ্যপান এবং কিছু ওষুধের প্রভাবেও স্মৃতির সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাই বারবার ভুলে যাওয়ার সমস্যাকে নিজে থেকে কোনো নির্দিষ্ট রোগের লক্ষণ ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
স্মৃতি ভালো রাখতে কী করবেন?
মস্তিষ্ক ও স্মৃতির স্বাস্থ্যের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাবার এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। একই সময়ে অনেক কাজ করার পরিবর্তে একটি কাজের দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং অতিরিক্ত কাজের চাপ কমানোর চেষ্টা করাও উপকারী হতে পারে।
সব মিলিয়ে, মাঝে মধ্যে পরিচিত কোনো নাম বা শব্দ মনে না পড়া স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে। কিন্তু সমস্যা যদি ঘন ঘন হয়, ক্রমশ বাড়ে বা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, তাহলে সেটিকে সাধারণ ভুলে যাওয়া বলে এড়িয়ে না গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
সান নিউজ/ জামান
