এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের পেছনে একাধিক কারণ সামনে এসেছে। খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের পেশাদারিত্বের ঘাটতি, দীর্ঘমেয়াদি শিখন ঘাটতি, নবম ও দশম শ্রেণিতে ভিন্ন কারিকুলামের চাপ, গণিত ও ইংরেজিতে মৌলিক দুর্বলতা, শিক্ষক সংকট, মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা এবং গ্রাম-শহরের বৈষম্য সবকিছুই এবারের ফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরের ফলাফলে পাশের হার গত বছরের তুলনায় ৬ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২২ হাজারের বেশি। শিক্ষাবিদরা বলছেন, এবারের ফলাফল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলোকে সামনে এনেছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কারণগুলো চিহ্নিত করে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, মাধ্যমিকের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা করোনার প্রভাবের মধ্যে পড়েছে। এরপর ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে নতুন কারিকুলাম চালু হয়, কিন্তু দশম শ্রেণিতে আবার ভিন্ন কারিকুলামে পড়াশোনা করতে হয়েছে। এর সঙ্গে এবার পরীক্ষার হলে সিসিটিভি ক্যামেরাসহ নানা ধরনের কড়াকড়ি ছিল। দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতিও ফল খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, ‘এতকিছুর পরও এই ফলকে ইতিবাচকভাবে দেখছি। এখন সরকারের দায়িত্ব হবে শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতের ওপর বেশি জোর দিতে হবে।’
গণিত ও ইংরেজিতে মৌলিক দুর্বলতা
এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে ফেল করেছে ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে গণিতে ফেল করেছে ২২ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় দুই বিষয়েই ফেলের হার বেড়েছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণিতে অনুশীলনের অভাব ও মৌলিক ধারণার ঘাটতি এবং ইংরেজিতে গ্রামার, রিডিং ও ভাষাগত দক্ষতার দুর্বলতা ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান তপন কুমার সরকার বলেন, ইংরেজি ও গণিতে মৌলিক দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ কর্মসূচি প্রয়োজন। পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ বাড়াতে হবে। গণিত নিয়মিত অনুশীলনের বিষয় হলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কম প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
মুখস্থ ও গাইডনির্ভর পড়াশোনার প্রভাব
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই বুঝে শেখার পরিবর্তে উত্তর মুখস্থ করার প্রবণতা বেড়েছে। গাইড বই, নোট ও সাজেশনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে প্রশ্নের ধরন পরিবর্তন হলে অনেক শিক্ষার্থী সমস্যায় পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, কারিকুলামের শিখনফল অনুযায়ী প্রশ্ন তৈরি করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা কী শিখেছে, কী বুঝেছে, কীভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে—এসব যাচাই করা জরুরি।
তিনি বলেন, শুধু বইয়ের তথ্য মুখস্থ করিয়ে মূল্যায়ন করলে শিক্ষার প্রকৃত মান বোঝা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে দেশে এখনো অভিন্ন ও মানসম্মত মূল্যায়ন পদ্ধতি পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষক সংকটে ব্যাহত পাঠদান
দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম থাকায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। একজন শিক্ষককে একাধিক ক্লাস নিতে হচ্ছে, ফলে শিক্ষার্থীদের আলাদা করে সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, শুধু শিক্ষক সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের নির্বাচনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিন মাস প্রস্তুতি নেওয়ার পরও বোর্ড পরীক্ষায় ফেল করলে শুধু শিক্ষার্থীকে দায়ী করা যায় না। এর পেছনে বিদ্যালয়ের পাঠদান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম বাস্তবায়ন ও শিক্ষকদের পেশাগত দায়বদ্ধতার বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
গ্রাম-শহরের বৈষম্যও প্রভাব ফেলেছে ফলে
এবারের ফলাফলে শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাশের হার ও জিপিএ-৫ তুলনামূলক বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলের অনেক প্রতিষ্ঠানের ফল খারাপ হয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, গ্রামাঞ্চলে দক্ষ শিক্ষক সংকট বড় সমস্যা। শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফল তুলনামূলক ভালো হলেও গ্রাম ও শহরের বৈষম্য দিন দিন প্রকট হচ্ছে।
তিনি বলেন, করোনার পর থেকেই অনেক শিক্ষার্থী শিখন ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতারও প্রভাব পড়েছে ফলে। গ্রাম-শহরের বৈষম্য কমানো এবং শিক্ষক সংকট দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শিক্ষাবিদদের মতে, এবারের এসএসসির ফলাফলকে শুধু ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করার সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সান নিউজ/ হুমায়রা
