বিদেশে গিয়ে কাজ করবেন। আয় করে সংসারের অভাব দূর করবেন। বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফুটবে এমন স্বপ্ন নিয়েই ঘর ছেড়েছিলেন মাদারীপুর সদর উপজেলার পূর্ব টুবিয়া গ্রামের রাহাত তালুকদার ও আরাফাত কাজী। ইতালিতে যাওয়ার কথা ছিল তাদের। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পরিবারের সঞ্চয়, জমিজমা ও ধার করা টাকা তুলে দেওয়া হয়েছিল দালালদের হাতে।
কিন্তু ইতালির বদলে তাদের গন্তব্য হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়া। সেখানে একাধিকবার হাতবদল হওয়ার পর তারা পৌঁছান কথিত একটি ‘গেমঘরে’। এরপর শুরু হয় বন্দিজীবন। পরিবারের কাছে পাঠানো হতো নির্যাতনের ভিডিও। মুক্তির বিনিময়ে চাওয়া হতো মোটা অঙ্কের টাকা।
প্রায় এক বছর পর গত ৮ আগস্ট দেশে ফিরেছেন রাহাত তালুকদার (২৮) ও আরাফাত কাজী (২৫)। বর্তমানে তারা মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। শরীরের ক্ষত শুকিয়ে এলেও সেই ভয়াবহ সময়ের স্মৃতি এখনো তাড়া করছে তাদের।
‘হাত-পা বেঁধে মারধর করত’ হাসপাতালের শয্যায় বসে লিবিয়ার দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন রাহাত। তার চোখেমুখে তখনো আতঙ্কের ছাপ।
রাহাতের ভাষ্য, প্রতিদিন কয়েক দফায় তাদের মারধর করা হতো। নির্যাতনের আগে হাত-পা বেঁধে ফেলা হতো। মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে দেওয়া হতো, যাতে চিৎকার করে সাহায্য চাওয়া না যায়। কখনো প্লাস্টিকের পাইপ, কখনো লোহার পাইপ দিয়ে পেটানো হতো।
তিনি বলেন, সিগারেটের আগুনে শরীরের বিভিন্ন জায়গা পোড়ানো হয়েছে। এমনকি হাতের নখও তুলে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রাহাত জানান, একসময় দিন-রাতের হিসাবও হারিয়ে ফেলেছিলেন। একটি ঘরে শত শত মানুষকে আটকে রাখা হতো। খাবার দেওয়া হতো অল্প। পরিবারের কাছে ফোন করে টাকা আনতে বলা হতো। টাকা দিতে দেরি হলে নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়ত।
‘অনেক কিছু এখনো ঠিকমতো মনে করতে পারি না’—বলতে বলতে কিছুক্ষণ নীরব থাকেন রাহাত। পরে বলেন, “তারপরও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, আমরা জীবিত দেশে ফিরতে পেরেছি।”
ইতালির নামে যাত্রা, লিবিয়ায় গিয়ে বন্দি
রাহাতের পরিবারের দাবি, ২০২৫ সালের মার্চের দিকে কয়েকজন স্থানীয় দালাল তাকে ইতালিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন। ভালো বেতনের চাকরি ও উন্নত জীবনের আশ্বাস দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে টাকা জোগাড় শুরু করেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মজিবর শেখ, শামসু ফকির ও মাহাবুব মুন্সির মাধ্যমে মূল দালাল সুমন বেপারীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। প্রথমে ইতালি পাঠানোর জন্য প্রায় ২২ লাখ টাকা দেওয়ার কথা হয়। পরে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাকে একটি সশস্ত্র চক্রের কাছে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
এরপর শুরু হয় একাধিকবার হাতবদল। একপর্যায়ে রাহাতকে কথিত ‘গেমঘরে’ আটকে রাখা হয়। সেখানে নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে পরিবারের কাছে পাঠানো হতো বলে অভিযোগ স্বজনদের। ভিডিও দেখিয়ে আরও টাকা দাবি করা হয়। পরিবারের দাবি, এভাবে আরও প্রায় ২৫ লাখ টাকা দিতে হয়েছে তাদের।
‘ছেলের ভিডিও দেখে বুকটা ফেটে যাচ্ছিল’
রাহাতের মা মায়া বেগমের কাছে ছেলেকে বিদেশে পাঠানো ছিল পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নই পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে।
তিনি বলেন, “ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম সংসারের হাল ধরবে, আমাদের কষ্ট কমাবে—এই আশায়। পরে জানতে পারি, ইতালিতে নয়, লিবিয়ায় আটকে আছে।”
ছেলের নির্যাতনের ভিডিও দেখার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
মায়া বেগম বলেন, “ছেলের ওই অবস্থা দেখে মনে হয়েছে বুকের ভেতরটা কেউ ছিঁড়ে ফেলছে। ওকে বাঁচানোর জন্য যা ছিল, সব দিয়েছি। ধার করেছি, মানুষের কাছে হাত পেতেছি। অনেক দিন জানতামই না ছেলে বেঁচে আছে কি না। এখন তাকে সামনে পেয়েছি—আল্লাহর কাছে লাখো শুকরিয়া।”
তিনি দালালদের শাস্তির দাবি জানিয়ে বলেন, “আর কোনো পরিবার যেন এভাবে সন্তানের জন্য অপেক্ষা না করে।”
রাহাতের দুলাভাই জামাল মাতুব্বরের অভিযোগ, নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে একের পর এক টাকা দাবি করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্নভাবে টাকা জোগাড় করে দিলেও দীর্ঘ সময় রাহাতের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
আরাফাতের শরীরেও বন্দিজীবনের চিহ্ন
রাহাতের মতোই আরাফাত কাজীর বিদেশযাত্রার গল্পও শুরু হয়েছিল ইতালির স্বপ্ন দিয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকেও লিবিয়ায় বন্দিজীবনের মুখোমুখি হতে হয়।
আরাফাত বলেন, “আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ও এলাকার মানুষ ছিল। সবার স্বপ্ন ছিল ইউরোপে যাওয়ার। লিবিয়ায় যাওয়ার পর বুঝতে পারি, আমরা আসলে বন্দি।”
তার অভিযোগ, হাত-পা বেঁধে মারধর করা হতো। মুখে টেপ লাগিয়ে চিৎকার বন্ধ করে দেওয়া হতো। পরিবারের কাছে ফোন করে টাকা আনতে বলা হতো। টাকা না এলে আবার শুরু হতো নির্যাতন।
আরাফাতের দাবি, শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম লোহা দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। পায়ের তলায় মারধর করে গুরুতর জখম করা হয়েছিল। এখনো খালি পায়ে হাঁটতে গেলে ব্যথা ও জ্বালাপোড়া হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরাফাতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তার স্বজনেরা।
‘সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা দিয়েছি’
আরাফাতের বড় ভাই মাহাবুব কাজীর অভিযোগ, ভাইকে দেশে ফেরাতে পরিবারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, “জমি বিক্রি করেছি, ঋণ করেছি। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা দালালদের দিয়েছি। স্থানীয় কয়েকজনের মাধ্যমে এই টাকা দেওয়া হয়েছে।”
তার দাবি, এত টাকা দেওয়ার পরও ভাইকে জীবিত ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না।
মাহাবুব বলেন, “আজ ভাইকে ফিরে পেয়েছি—এটাই সবচেয়ে বড় কথা। কিন্তু যারা আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে এবং এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সম্ভব হলে আমাদের টাকাও ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে।”
একই গ্রামের আরও বহু পরিবারের অপেক্ষা
পূর্ব টুবিয়া গ্রামে কথা বলে জানা গেছে, রাহাত ও আরাফাতের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয় বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের ভাষ্য, ওই এলাকায় বিদেশে যাওয়ার প্রলোভনে পড়ে লিবিয়ায় আটকে পড়া বা পাচারের শিকার হয়েছেন আরও অনেক যুবক।
স্থানীয়দের দাবি, গ্রামের অর্ধশতাধিক যুবক কোনো না কোনোভাবে বিদেশে পাঠানোর নামে দালালচক্রের খপ্পরে পড়েছেন। কারও সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ নেই, কেউ বন্দিদশায় আছেন বলে স্বজনদের ধারণা, আবার কেউ মুক্তিপণের টাকা দেওয়ার পরও স্বজনের সন্ধান পাননি।
এলাকাবাসী জুবায়ের তালুকদার, মহাসিন তালুকদার ও সিয়াম তালুকদার বলেন, “দালালরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিদেশে চাকরি ও ভালো জীবনের কথা বলে মানুষকে আকৃষ্ট করে। তাদের কথায় বিশ্বাস করে অনেকে জমি বিক্রি ও ঋণ করে টাকা দিয়েছেন। এখন অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত।”
তাদের মতে, শুধু স্থানীয় পর্যায়ের দালালদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দেশের বাইরে থাকা মূল চক্রের সদস্যদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা আসাদ ও সুজন বলেন, বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারণার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার আগে বৈধতা যাচাই ও দালালদের বিষয়ে সতর্ক হওয়ার জন্য জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার।
তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
দেশে ফিরেছেন দুজন, অপেক্ষা এখনো অনেকের
রাহাত ও আরাফাত ফিরে এসেছেন। পরিবারের কাছে তাদের ফেরার খবর নিঃসন্দেহে স্বস্তির। কিন্তু তাদের শরীরের ক্ষত যেমন পুরোপুরি শুকায়নি, তেমনি মুছে যায়নি বন্দিজীবনের আতঙ্কও।
তাদের গল্পের ভেতর দিয়ে সামনে এসেছে আরও একটি বড় প্রশ্ন ইতালিতে ভালো চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে কতজন তরুণকে এখনো লিবিয়ার মতো অনিশ্চিত পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে?
পূর্ব টুবিয়ার অনেক ঘরেই সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন স্বজনেরা। কোথাও নিখোঁজ সন্তানের অপেক্ষা, কোথাও বন্দি স্বামীর খবরের আশায় দিন গোনা, আবার কোথাও মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া পরিবারের দীর্ঘশ্বাস।
রাহাত ও আরাফাতের দেশে ফেরা তাই শুধু দুটি পরিবারের স্বস্তির খবর নয়; একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নের আড়ালে থাকা মানবপাচারের ভয়াবহ ঝুঁকিরও একটি সতর্কবার্তা।
সান নিউজ/ জামান
