কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে আবারও অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পজুড়ে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা ‘টার্গেট কিলিং’-এর ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আধিপত্য বিস্তার, মাদকপাচার, চাঁদাবাজি এবং ব্লকভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্বকে এসব হত্যার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্যাম্পে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে প্রতিপক্ষের সদস্য, হেড মাঝি, সাব-মাঝি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। এতে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে।
তিন বছরে নিহত অন্তত ৫০ নেতা
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অন্তত ৫০ জন হেড মাঝি, সাব-মাঝি ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই ৩৪টি ক্যাম্পে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। এর আগে ২০২৫ সালে ৩৫ জন, ২০২৪ সালে ৪৯ জন এবং ২০২৩ সালে ৬৬ জন প্রাণ হারান। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কয়েক শতে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সক্রিয় সাত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অসংখ্য ডাকাত চক্র
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে একাধিক সশস্ত্র সংগঠন এবং প্রায় ৪০টি ছোট-বড় ডাকাত চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষ, অপহরণ, গুলি ও হত্যার ঘটনা ঘটছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ক্যাম্পের প্রতিটি ব্লকের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই চাঁদাবাজি, মাদকপাচার এবং অন্যান্য অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হয়। এজন্য প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দিতে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের কণ্ঠও দমন করা হচ্ছে
তদন্তে উঠে এসেছে, শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সদস্য নয়, শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তি, সমাজসেবী, শিক্ষক এবং সাধারণ রোহিঙ্গা নেতারাও হামলার শিকার হচ্ছেন।
যারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে ক্যাম্পের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরতে চান অথবা সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলেন, তাদেরও ভয়ভীতি ও সহিংসতার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের হামলার উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কেউ যাতে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে না পারে।
মাদকপথ ও চাঁদাবাজি ঘিরে সংঘাত
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার সীমান্ত ঘেঁষা কিছু এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই অবৈধ বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত বাড়ছে।
এ ছাড়া ক্যাম্পের বাজার, দোকানপাট এবং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। যে গোষ্ঠী কোনো ব্লকের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তারাই ওই এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা বা নতুন করে দখল নেওয়ার লড়াই থেকেই অনেক হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যবেক্ষণ
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্যাম্পে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধই সাম্প্রতিক সহিংসতার অন্যতম কারণ। তাদের মতে, এসব গোষ্ঠীর আধিপত্য কমিয়ে আনতে পারলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মত, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে না পারলে টার্গেট কিলিং বন্ধ করা কঠিন হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মত
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে অপরাধচক্র ভেঙে দেওয়া, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা, ক্যাম্প প্রশাসনকে আরও কার্যকর করা এবং সাধারণ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
তাদের মতে, মাদক, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে না আনলে ক্যাম্পে সহিংসতা কমানো কঠিন হয়ে পড়বে।
