রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় নিহত রাকিব হোসেনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া হত্যা মামলার তদন্ত সম্পন্ন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত শেষে আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এজাহারে নাম থাকা আরও ৪৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. মমিনুল ইসলাম তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে গত ১৩ জুলাই সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাক্ষ্য, আলামত এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার মতো উপাদান পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, যাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ মেলেনি বা ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে যাদের নাম রয়েছে
অভিযোগপত্রে শেখ হাসিনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্য ও নেতার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
৪৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মেলেনি
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এজাহারে অন্তর্ভুক্ত ৪৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্তে এমন তথ্যও উঠে এসেছে যে, কয়েকজন ঘটনার সময় মিরপুর এলাকায় উপস্থিত ছিলেন না এবং কিছু নাম অসৎ উদ্দেশ্যে মামলায় যুক্ত করা হয়ে থাকতে পারে। এসব বিবেচনায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা নিয়ে আদালতের রায়ের পর দেশজুড়ে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অংশ নিলে তা দ্রুত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আন্দোলন দমনে বিভিন্ন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তদন্তে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী আন্দোলন প্রতিরোধে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়েছে।
তবে অভিযোগপত্রে উল্লিখিত এসব বক্তব্য তদন্তকারী সংস্থার দাবি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত বা অপ্রমাণিত হবে।
মরদেহ উত্তোলনের উদ্যোগ সফল হয়নি
তদন্ত চলাকালে নিহত রাকিব হোসেনের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য আদালতের অনুমতি নেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী প্রশাসনের কর্মকর্তারা কবরস্থানে গেলেও পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের আপত্তির কারণে মরদেহ উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার দিন যা ঘটেছিল
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় রাকিব হোসেন মিরপুর-১০ এলাকায় উপস্থিত ছিলেন। রাতের দিকে একটি মিছিল গোলচত্বরে পৌঁছালে সেখানে গুলির ঘটনা ঘটে। এতে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পরবর্তীতে তার বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক মরদেহ ঝিনাইদহে নিয়ে যান। সে সময়ের পরিস্থিতির কারণে ময়নাতদন্ত ছাড়াই পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরে একই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর মিরপুর মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পরিবারের
নিহত রাকিব হোসেনের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, তার ছেলে এমআইএসটি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি জানান, অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি আগে জানতেন না।
তার ভাষ্য, নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হোক—এটাই পরিবারের প্রত্যাশা।
