পদোন্নতি ও গ্রেড উন্নীতকরণের প্রস্তাব চারবার প্রত্যাখ্যান, ২১ বছর একই পদে চাকরি করছেন অনেকে
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও গ্রেড উন্নীতকরণের প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা। ইসির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত চারবার একই ধরনের প্রস্তাব পাঠানো হলেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তা অনুমোদন করেনি। এতে পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন একই পদে থেকে অনেকেই সামাজিক, পারিবারিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, একটি দপ্তরের পদমর্যাদা বাড়ালে অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও একই ধরনের দাবি আসতে পারে—এ বিষয়টি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
২১ বছরেও একই পদে
২০০৫ সালে উপজেলা নির্বাচন অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন মো. ছামিউল আলম। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা নির্বাচন অফিসে প্রথম কর্মস্থল দিয়ে শুরু হয় তার চাকরিজীবন। দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ২০২৬ সালেও তার পদবি রয়ে গেছে ‘উপজেলা নির্বাচন অফিসার’।
বর্তমানে তিনি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছামিউল আলম জানান, একই পদে দীর্ঘ ২১ বছর কাজ করতে গিয়ে মানসিকভাবে হতাশ হয়ে পড়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমাদের সঙ্গে যারা একই সময়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন, তাদের অনেকে এখন নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে চলে গেছেন। অথচ আমরা এখনো একই পদে রয়েছি। এতে পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে।”
তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন একই দায়িত্ব পালন করায় নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও সীমিত হয়ে গেছে। ফলে কর্মক্ষেত্রে এক ধরনের একঘেয়েমি তৈরি হচ্ছে।
ব্যাচমেটদের অধীনে কাজের বাস্তবতা
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ এমদাদুল হক। তিনিও ২০০৫ সালে চাকরিতে যোগ দেন।
তিনি জানান, তার ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা বর্তমানে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, পরিচালক, উপসচিব, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কিংবা সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এমদাদুল হক বলেন, “দেশের ৬৪ জেলার নির্বাচন কর্মকর্তাদের অনেকেই আমার ব্যাচমেট। ফলে কর্মজীবনে বিভিন্ন জায়গায় তাদের অধীনে কাজ করতে হচ্ছে। একসময় যারা সমপর্যায়ের ছিলেন, তাদের অধস্তন হিসেবে কাজ করা মানসিকভাবে কঠিন।”
তিনি আরও বলেন, পদোন্নতি না হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির প্রভাব পড়ছে পরিবারেও।
একই দায়িত্ব, ভিন্ন গ্রেড
ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো গ্রেড বৈষম্য। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ১৯টি জেলায় ৫ম গ্রেডের সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে ৪৫টি জেলায় রয়েছেন ৬ষ্ঠ গ্রেডের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা।
কর্মকর্তাদের দাবি, একই ধরনের দায়িত্ব পালন করলেও গ্রেডের এই পার্থক্য প্রশাসনিক বৈষম্য তৈরি করছে। এর মধ্যে ৪৫টি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে ৬ষ্ঠ গ্রেডের অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকারী ও অধস্তন কর্মকর্তার গ্রেড সমান হয়ে গেছে।
২০০৫ সালের পর নিয়োগপ্রাপ্তদের পদোন্নতি নেই
ইসির সর্বশেষ গ্রেডেশন তালিকা অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অধীনে বর্তমানে ৭৩৮ জন কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন ৭২১ জন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০০০ ও ২০০৪ সালের ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হলেও ২০০৫ সালের ব্যাচে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই ব্যাচের ১০০ জনের বেশি কর্মকর্তা দীর্ঘ ২১ বছর ধরে একই পদে রয়েছেন।
আইনি জটিলতা শেষে তাদের মধ্যে প্রায় ৮০ জন উপজেলা নির্বাচন অফিসার হিসেবে পুনরায় যোগদান করেছেন। তবে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও তাদের পদোন্নতি এখনো নিশ্চিত হয়নি।
এ ছাড়া ২০০৫ সালের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া প্রায় ৪২০ জন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তারও এখন পর্যন্ত পদোন্নতির সুযোগ হয়নি।
চারবার প্রস্তাব, চারবারই জট
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, ২০১৮ সাল থেকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও গ্রেড উন্নীতকরণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
২০১৯ সালে ৪৫টি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার পদ ৫ম গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাব পাঠায় ইসি। পরে ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও একই বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আবারও প্রস্তাব পাঠানো হয়।
সর্বশেষ প্রস্তাবে ৪৫টি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার পদ ৬ষ্ঠ গ্রেড থেকে ৫ম গ্রেড এবং ২০ জন অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার পদ উন্নীত করার দাবি জানানো হয়।
তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এসব প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি।
জনপ্রশাসনের বক্তব্য
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে এবং বিভিন্ন দপ্তরের মতামত নেওয়া হয়েছে।
সহকারী সচিব মো. শফিকুর রহমান বলেন, একটি দপ্তরের পদমর্যাদা বাড়ানো হলে অন্য সরকারি দপ্তর থেকেও একই ধরনের দাবি আসতে পারে। তাই সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, পদমর্যাদা ও গ্রেড উন্নীতকরণের বিষয়গুলো নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
ইসি এখনো আশাবাদী
বাংলাদেশ ইলেকশন কমিশন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন কমিশনকে একটি স্বতন্ত্র ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পদোন্নতি ও পদ আপগ্রেডেশন জরুরি।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, প্রস্তাবটি যৌক্তিক বিবেচনা করেই পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে আবারও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে।
তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টিকে যৌক্তিক মনে করছি। তাই কমিশনের অনুমোদন নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আবারও উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদ বলেন, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিন পদোন্নতি বঞ্চিত থাকা প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রকাশ।
তার মতে, নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ মাঠপর্যায়ের কাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, “একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব, কাজের চাপ ও ন্যায্য দাবিগুলো বিবেচনায় নিতে হবে।”
দীর্ঘদিনের এই পদোন্নতি জট দ্রুত নিরসন না হলে নির্বাচন কমিশনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: ঢাকা পোস্ট
আমার বাঙলা/ হুমায়রা
