বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে একটু ভালো করে তাকালে দেখা যায় উপরে হিমালয়ের দক্ষিণ ঢাল আর নিচে বঙ্গোপসাগরের বিপুল জলরাশি, ঠিক তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক টুকরো জমি। বাহ্যিকভাবে দেখে মনে হতে পারে এ যেন কেবলই নদী আর পলল মাটির দেশ। কিন্তু ভূরাজনীতির সমীকরণ বলছে অন্য কথা।
ভারত, চীন আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঠিক ত্রিভুজাকার মোহনায় অবস্থান হওয়ায় এই মাটির প্রতিটা সেন্টিমিটার এখন আন্তর্জাতিক শক্তির খেলায় এক একটা দাবার গুঁটি। এই যে চারপাশে করিডোর, ট্রানজিট আর সংযোগের নানা আওয়াজ উঠছে, এগুলো কি স্রেফ দুটো গাড়ির চাকা চলার রাস্তা? একদম নয়। রাস্তা বা বন্দর বানানো কোনোদিনই কেবল সিমেন্ট-কংক্রিটের হিসাব থাকে না। এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে ক্ষমতার ভারসাম্য, গোয়েন্দা নজরদারি আর এক দেশের কাঁধে অন্য দেশের নিরাপত্তার ভার সঁপে দেওয়ার গভীর ছক। তাই করিডোর নিয়ে যখনই আমাদের দেশে তর্ক ওঠে, তখন শুধু কত টাকা লাভ হলো আর কত টাকা মাশুল পাওয়া গেল—সেসব খুচরো অঙ্কে মাপা চরম বোকামি। এটা সোজা হিসাব, ভারতের সাতটি বোন বা ‘সেভেন সিস্টার্স’কে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দ্রুত জোড়ার জন্য ভারতের ব্যাকুলতা নতুন কিছু নয়। মাত্র ২২ কিলোমিটারের সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’ তাদের মাথার ওপর এক মস্ত বড় নিরাপত্তার তলোয়ার হয়ে ঝুলছে। তাই আমাদের ভেতর দিয়ে কম খরচে কম সময়ে পণ্য আর ট্রেন পৌঁছানোর চাহিদা তাদের বহুদিনের। অন্যদিকে চীন চাচ্ছে কুনমিং থেকে একদম কলকাতার বুক ছুঁয়ে যাওয়া বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোরের মাধ্যমে এই অঞ্চলে নিজের পণ্যের জোয়ার ভাসিয়ে দিতে। ওদিকে আবার মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যা চলছে, সেসবকে উসিলা করে জাতিসংঘের ছাতার তলে ‘মানবিক করিডোর’ বানানোর নতুন পরিকল্পনা । রাস্তাগুলোর নাম আলাদা, উদ্দেশ্য আলাদা, কিন্তু দিনশেষে আমাদের দেশের জন্য প্রশ্নটা এক—কোনো দেশের সুবিধার্থে কি নিজের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া যায়?
এখানে সবচেয়ে বড় কথা হলো সার্বভৌমত্ব।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস খুব নিষ্ঠুরভাবে আমাদের শেখায়, চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থান যেমন একটা দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, ঠিক তেমনি তা আবার ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ দুর্যোগ। ইতিহাস খুলে দেখুন না, মধ্য এশিয়ার বিশাল সমভূমি কিংবা পূর্ব ইউরোপের ছোট ছোট দেশগুলো কীভাবে শক্তিকেন্দ্রগুলোর রেষারেষির কারণে ছারখার হয়ে গেছে। তারা করিডোর দিতে গিয়ে নিজেদের ঘরকেই পরের যুদ্ধের ময়দান বানিয়ে ফেলেছিল। বাংলাদেশের ভুল করার কোনো সুযোগ নেই। একটা চুক্তি করে সামান্য কিছু ডলার পকেটে ভরলাম, আর সেই ফাঁকে বিদেশি সৈন্য, গোয়েন্দা কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর আনাগোনা আমাদের ভূখণ্ডে বেড়ে গেল—এমন দেউলিয়াপনা কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র মেনে নিতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইনেও কিন্তু করিডোরের কোনো নির্দিষ্ট বাঁধাধরা সংজ্ঞা নেই। চুক্তিটা কীভাবে সই হচ্ছে, কাস্টমস তদারকি কার হাতে থাকছে, দেশের পুলিশ নাকি বিদেশি নিরাপত্তারক্ষীরা পাহাড়ায় থাকছে—তার ওপর নির্ভর করে সেটা কি কেবলই ব্যবসা, নাকি ফাঁদে পা দেওয়া।
অবশ্য এর মানে এই নয় যে আমরা দরজাকপাট বন্ধ করে আতঙ্কে কুঁকড়ে বসে থাকব। ভূগোলকে ভয়ের বদলে শক্তিতে রূপান্তর করার উদাহরণ দুনিয়ায় কম নেই। সিঙ্গাপুরের মতো ছোট দেশ কীভাবে নিজেদের সমুদ্রপথকে বুদ্ধি খাটিয়ে ব্যবহার করে বিশ্ব বাণিজ্যের হুকুমদাতা হয়ে বসল, তা কারোর অজানা নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা ইউরোপের নেদারল্যান্ডসও তো এই একই পথে গিয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলেছে। আমাদের চট্টগ্রাম, মোংলা কিংবা নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দরগুলোকে যদি সঠিক উপায়ে ব্যবহার করা যায়, তবে শিপিং, লজিস্টিকস, গুদামজাতকরণ আর শিল্পায়নের এক বিশাল সুযোগ উন্মোচিত হতে পারে। তবে কথা একটাই, সম্পর্ক হতে হবে সমান সমান। প্রতিবেশীর মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজের ঘরে বাতি নেভানো কোনো সুস্থ পররাষ্ট্রনীতি হতে পারে না। প্রত্যেকটা চুক্তি হতে হবে পুরোপুরি স্বচ্ছ, যেখানে প্রতিটি খরচের বিপরীতে নিশ্চিত মুনাফা এবং সমতার গ্যারান্টি থাকবে।
ঠিক এই জায়গাটাতেই আমাদের দরকষাকষির মূল পরীক্ষাটা দিতে হয়। এখন ভারত আর চীনের মারামারি শুধু হিমালয়ের বরফাবৃত সীমান্তে আটকে নেই। তাদের লড়াই ঢুকে গেছে আমাদের বন্দর, রেলপথ, ডিজিটাল ক্যাবল আর পাওয়ার গ্রিডের ট্রানজিটে। ভারত চায় তার ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির অধীনে বঙ্গোপসাগরে নিজের একচ্ছত্র প্রভাব বজায় রাখতে। অন্যদিকে চীন তার বিআরআই বা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে এখানে অবকাঠামোর বন্যা বইয়ে দিতে চায়। এই দুই পরাশক্তির মল্লযুদ্ধের মাঝে বাংলাদেশের কাজটা কঠিন। কারও লেজুরবৃত্তি করা যাবে না, আবার কারও সঙ্গে সম্পর্কও নষ্ট করা চলবে না। সোজা কথায়, কোনো এক পক্ষের কৌশলগত উপগ্রহ বা ‘স্যাটেলাইট স্টেট’ না হয়ে আমাদের নিজস্ব অবস্থান ধরে রাখতে হবে। আমাদের বহু পুরোনো নীতি ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’—কথাটাকে এখনকার বাস্তবতায় নতুন করে ঝালাই করে প্রয়োগ করতে হবে।
একই কথা খাটে রাখাইনকে ঘিরে যে ‘মানবিক করিডোর’-এর কথা উঠছে, তার ক্ষেত্রেও। প্রায় বারো লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বহু বছর ধরে মানবতার এক নজিরবিহীন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সেই জায়গা থেকে সীমান্ত পেরিয়ে খাদ্য বা ওষুধ পৌঁছানোর কথা শুনলে আবেগাক্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক। তবে আবেগ আর জাতীয় নিরাপত্তা এক জিনিস নয়। রাখাইন এখন কোনো সাধারণ এলাকা নয়; সেখানে মিয়ানমার জান্তা আর আরাকান আর্মির মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে, যার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ নেই। এমন একটা অস্থির জায়গায় হুট করে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে করিডোর খুলে দিলে নিজেদের সীমান্ত ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। কোনো অবস্থাতেই মানবিকতাকে ঢাল বানিয়ে চরমপন্থী কিংবা আন্তর্জাতিক চক্রান্তকে আমাদের মাটিতে ঘাঁটি গাড়তে দেওয়া যাবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা, মিয়ানমারের সঙ্গে যেকোনো আলোচনার মূল লক্ষ্য হতে হবে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ অধিকারসহ তাদের নিজের ভিটেমাটিতে ফেরত পাঠানো। এই প্রধান দাবিকে পাশে সরিয়ে অন্য কোনো সাময়িক করিডোরের ফাদে পা দেওয়া কোনো কাজের কথা নয়।
বাস্তবতার নিরিখে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামটাও উচ্চারণ করছেন কেউ কেউ। সংবিধান অনুযায়ী আমাদের রাষ্ট্রপতির কাজ বা একক ক্ষমতা কতটা, তা আইনি কাঠামোর ভেতর স্পষ্ট করা আছে। কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মূল কাজটা করে নির্বাচিত সরকার ও মন্ত্রিসভা। তাই এককভাবে কেউ নীতি নির্ধারণ করে ফেলবেন—এমনটা ভাবা ভুল। কিন্তু ড. ইউনূসের যে বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, পশ্চিমা বিশ্ব এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে তাঁর যে গভীর যোগাযোগ, সেটিকে কূটনৈতিক চাল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ অনেক। তিনি যখন কথা বলেন, বিশ্বদরবারে সেটা আলাদা ওজন তৈরি করে। এই আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে যদি আমরা দেশের স্বার্থে, আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার কাজে লাগাতে পারি, তবে সেটা কৌশলগতভাবে বড় এক প্লাস পয়েন্ট। তবে শেষ সিদ্ধান্ত অবশ্যই আসতে হবে দেশের সংবিধান, নির্বাচিত সংসদ এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে। এখানে উল্লেখ্য, কারও কারও মতে বর্তমান সরকার চাইলেও ড: মুহাম্মদ ইউনূস কখনোই রাষ্ট্রপতি হবেন না। কারণ তিনি ইতিমধ্যে প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে সসর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। রাষ্ট্রপতি হল অলংকারিক পদ। তাই উনাকে প্রস্তাব দিলেও তিনি রাজি হবেন না বলে দাবি করছেন ওনার ঘনিষ্ঠ জনেরা।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে আলোচনার সময়ও আমাদের আবেগ সরিয়ে পুরোদস্তুর বাস্তববাদী ব্যবসায়ী কিংবা চতুর রাজপুত্রের মতো ভাবতে হবে। ভারত আমাদের নিকটতম বড় প্রতিবেশী, সর্ববৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার এবং ভৌগোলিক বাস্তবতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ভালো বন্ধুত্ব কোনোদিন একপাক্ষিক লেনদেনে টিকে থাকে না। ট্রানজিট কিংবা কানেক্টিভিটির মতো বড় বড় সুবিধা যখন আমরা আলোচনার টেবিলে তুলব, ঠিক তখনই সমান জোর দিয়ে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, সীমান্তে প্রতিদিনের প্রাণহানি বন্ধ, অশুল্ক বাণিজ্য বাধা দূর করা আর বাণিজ্যিক ঘাটতি কমানোর দাবি আদায় করে নিতে হবে। বছরের পর বছর একতরফা ছাড় দিয়ে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার দিন শেষ। একইভাবে চীনের বিনিয়োগ দেখলেই অমুক ‘ঋণের ফাদ’ বলে আঁতকে ওঠার কিছু নেই, আবার অন্ধের মতো সব প্রজেক্ট গিলে ফেলাও বোকামি। চীনের টাকা নেওয়ার আগে প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভ, সুদের হার আর এর নেপথ্য রাজনৈতিক প্রভাব নিখুঁতভাবে মেপে নিতে হবে।
বর্তমান পৃথিবী আর একক কোনো পরাশক্তির ইশারায় চলে না, এটা বহু-মেরুকেন্দ্রিক এক বিশ্বব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা জাপান—সবাই নতুন নতুন সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন তৈরি করতে ব্যস্ত। এই বিশৃঙ্খল কিন্তু সম্ভাবনাময় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ যদি শুধু নিজের জমি আর জলসীমাকে অন্যের সুবিধার্থে ব্যবহারের অনুমতি দেয়, তবে অচিরেই আমাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে আসবে। আর আমরা যদি সেই একই ভূগোলকে নিজেদের শিল্পায়ন, বাণিজ্য এবং মর্যাদাপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যম বানাতে পারি, তবে এই মানচিত্রই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। করিডোর কোনো পিচ ঢালা সাধারণ রাস্তা নয়; এটি মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার এক জটিল পরীক্ষা। একটি দুর্বল বা হঠকারী চুক্তি আগামী কয়েক দশকের জন্য আমাদের হাত-পা বেঁধে ফেলতে পারে। অন্যদিকে একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে বদলে দিতে পারে চিরতরে। নিরপেক্ষ থাকা হয়তো কঠিন, কিন্তু নিজের ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে জানাটাই হলো প্রকৃত রাষ্ট্রনীতি। আর এই ভারসাম্যের কৌশলই ঠিক করে দেবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
ভূরাজনৈতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন কৌশল বিশ্লেষক
সান নিউজ/ এনআই
