নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পান চাষ এখন আর শুধু একটি কৃষিপণ্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। উপজেলার শতাধিক কৃষক পান চাষ ও বিপণনকে কেন্দ্র করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
অনেক কৃষকের কাছে পানের বরজ যেন একটি চলমান ব্যাংক। বছরের যেকোনো সময় বরজ থেকে পান সংগ্রহ করে বিক্রি করলেই হাতে আসে নগদ অর্থ।
বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে পানের গুরুত্ব অপরিসীম। বিয়ে, ধর্মীয় উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা অতিথি আপ্যায়নে এক খিলি পান আতিথেয়তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই চাহিদাকে কেন্দ্র করেই মনোহরদীতে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন জাতের পান চাষ হয়ে আসছে।
এ অঞ্চলে গোয়ালেশ্বর, লাল ডিঙি, হাইব্রিডসহ বিভিন্ন জাতের পানের পাশাপাশি বিশেষ ঔষধিগুণসম্পন্ন মিষ্টি সাঁচি পানেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাঁশের খুঁটি, কাঠি ও খড়ের ছাউনি দিয়ে তৈরি ছায়াঘেরা বরজে নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে ওঠে পানের লতা।
তুলনামূলক কম পরিশ্রমে ভালো লাভ হওয়ায় প্রতিনিয়ত নতুন উদ্যোক্তারা এ চাষে যুক্ত হচ্ছেন। কৃষকদের ভাষায়, একটি ভালো পানের বরজ মানেই সারা বছরের আয়ের নিশ্চয়তা। প্রয়োজনের মুহূর্তে বরজ থেকে পান তুলে বাজারে বিক্রি করলেই হাতে চলে আসে নগদ অর্থ, যা তাদের আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মনোহরদী উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হচ্ছে। চলতি মৌসুমে প্রায় দশ হাজার মেট্রিক টন পান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উপজেলার সব ইউনিয়নই কমবেশি পান চাষ হলেও লেবুতলা ও খিদিরপুর ইউনিয়নে উৎপাদনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
এই দুই ইউনিয়নে প্রায় ৯০% মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাণ চাষ ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। অনেকের মূল পেশার পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবে পানের বরজ গড়ে তুলেছেন। বরজের চারপাশ ঘেরা ও উপরে ছাউনি থাকায় পরিবারের নারীর সদস্যরা ও গৃহস্থালী কাজের পাশাপাশি পানের পরিচর্যায় অংশ নিতে পারেন।
ফলে পারিবারিকভাবেই এই কৃষি কাজ পরিচালনা করা সম্ভব হয়। পশ্চিম রামপুর গ্রামের সফল পান চাষী সুমন মিয়া জানান, প্রায় দশ বছর আগে মাত্র ৩০ শতাংশ জমিতে পান চাষ শুরু করেছিলেন তিনি। প্রথমদিকে লাভ তুলনামূলক কম হলেও গত ৬-৭ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ভালো মুনাফা পাচ্ছেন।
সেই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বরজের পরিধিও বাড়িয়েছেন।রোগবালায় নিয়ন্ত্রণে তিনি কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগ করেন। একই এলাকার আরেক পান চাষী কাশেম জানান, গত ১৫ বছর ধরে পান চাষ করেছেন। বর্তমানে তার ৪০ শতাংশ জমিতে বরজ রয়েছে।
বছরে প্রায় ২ লাখ টাকা উৎপাদন ব্যয় হলেও বাজারদর অনুকূলে থাকলে সব খরচ বাদ দিয়ে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব। মনোহরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রুনা আক্তার বলেন, জি আই পণ্য হিসেবে পান একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও ঔষধি গুনসম্পন্ন অর্থকরী ফসল। কম খরচে অধিক লাভের সুযোগ থাকায় কৃষকদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। এক সময় মনহরদী থেকে বিদেশে পান রপ্তানি হলেও বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে। তবে রপ্তানি কার্যক্রম পুনরায় চালু হলে এ অঞ্চলের কৃষকরা আরো বেশি লাভবান হবেন।
কৃষি বিভাগ নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কারিগরি পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে চাষীদের পাশে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বিদেশে রপ্তানি সুযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে মনোহরদীর পান দেশের অর্থনীতিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি হাজারো কৃষকের জীবন- জীবিকায় আসবে নতুন সমৃদ্ধির সম্ভাবনা ।
আমার বাঙলা/ রাব্বি
