টানা ভারি বর্ষণে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
হয়েছে কৃষকরা। ইতোমধ্যে আমন ধানের বীজতলা, রোপণকৃত চারা ও মৌসুমি শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
স্থানীয় মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, এটি শুধু অতিবৃষ্টির ফল নয়, বরং বছরের পর বছর পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, সেতু নির্মাণে নদীর গতিপথ সংকুচিত করা এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ছোট-বড় জলধারার অনেক স্থানে পুকুর বা দীঘি খনন করে অনেকে স্থায়ীভাবে পানি প্রবাহের পথে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, পানি প্রবাহের প্রাকৃতিক পথে স্থায়ীভাবে বাড়িঘর, দোকানপাট ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও উপজেলার ৫০ শতাংশেরও বেশি সেতু ও কালভার্টের মুখ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ হারিয়েছে।ফলে সামান্য বা ভারি বর্ষণেই বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। জানা যায়, সুন্দরগঞ্জ ১টি পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯ থেকে ১০টি ইউনিয়নের পানি মানস নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। এক সময় প্রবল স্রোতের কারণে নদীটি ‘ধার মানস’ নামে পরিচিত ছিল। স্থানভেদে নদীটির প্রস্থ ১২০ থেকে ১৫০ ফুট।
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়েরঅর্থায়নে গাইবান্ধা সদর উপজেলার মুর্শিদের বাজার এবং সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বদিয়ার মাঠের পূর্ব পার্শ্বে ও দক্ষিণ শ্রীপুরের লাহিরের খামার নতুন বন্দর কামারজানি সংযোগস্থলে ১টিসহ ৩টি সেতু নির্মাণের সময় নদীর বুকে ব্যাপক মাটি ভরাট করে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়। এতে নদীর কার্যকর প্রস্থ কমে যাওয়ায় স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। নির্মাণকৃত ব্রীজ আকারে ছোট হওয়ায় বীজের মুখে প্রচুর পরিমাণে জমে থাকা কচুরি পানাও পানি প্রবাহের অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে।
পানি নিষ্কাশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো শ্রীপুর ইউনিয়নের ৯নম্বর ওয়ার্ডের ওয়াপদা বাঁধের স্লুইস গেট। এলাকাবাসীর দাবি, বিশাল এই জনপদের পানি নিষ্কাশনের জন্য স্লুইস গেটের ছয়টি জলকপাটই সচল থাকা জরুরি। কিন্তু বর্তমানে ছয়টির মধ্যে মাত্র ৩টি খোলা রয়েছে ও বাকি ৩ টি বন্ধ থাকায় পানি নিষ্কাশন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বর্ষার পানি দীর্ঘ সময় ধরে জমে থেকে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। কৃষি বিভাগের হিসাব এখনো প্রকাশ না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী,উপজেলার নিম্ন এলাকায় আমন ধানের বীজতলা ও রোপণকৃত চারার প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। একই সঙ্গে শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলের ক্ষেত পানিতে ডুবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এতে কৃষকদের সামনে নতুন করে উৎপাদন ব্যয় ও খাদ্য নিরাপত্তার সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পানি প্রবাহের পথ দখলমুক্ত করা, সেতু ও কালভার্টের বন্ধ হয়ে যাওয়া মুখ খুলে দেওয়া, মানস নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সব জলকপাট সচল করার মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ না করলে সুন্দরগঞ্জে জলাবদ্ধতা আরও
ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন, যারা ব্রীজ ও কালভার্টের সামন বন্ধ করেছে, তাদেরকে নিজ দায়িত্বে স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হচ্ছে। প্রয়োজনে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অন্যদিকে, ছয়টি জলকপাটের মধ্যে তিনটি কেন এখনো খোলা হয়নি, এ বিষয়ে জানতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে বক্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে বাস্তবভিত্তিক সমীক্ষা চালিয়ে জলাবদ্ধতার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সুন্দরগঞ্জে প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের দুর্ভোগ দেখা দিতে পারে।
সান নিউজ/ জামান
