রাজধানীর অপরাধপ্রবণ এলাকার তালিকায় দীর্ঘদিন ধরে মোহাম্মদপুর ও আদাবরের নাম থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুর ও পল্লবীকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। একের পর এক খুন, গুলির ঘটনা, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি এবং কিশোর গ্যাংয়ের সহিংস কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসীর মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও বলছে, গত ছয় মাসে রাজধানীর বিভিন্ন বিভাগের তুলনায় মিরপুর বিভাগে খুন ও ডাকাতির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—মিরপুর কি ধীরে ধীরে রাজধানীর নতুন অপরাধকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে?
চৌরাঙ্গী মার্কেটে গুলির ঘটনায় আতঙ্ক
গত ৭ জুলাই রাতে মিরপুরের চৌরাঙ্গী মার্কেট এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সাইফুল সিজুর ওপর গুলির ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আসে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার পর মার্কেটে প্রবেশের মুহূর্তে পেছন থেকে এক মুখোশধারী হামলাকারী গুলি চালায়।
স্থানীয়রা ধাওয়া দিয়ে এক সন্দেহভাজনকে আটক করেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আটক ব্যক্তি এলাকার এক চিহ্নিত চাঁদাবাজের সহযোগী। ঘটনার পেছনে ফুটপাতের চাঁদা আদায় নিয়ে বিরোধের বিষয়টি আলোচনায় এলেও আহত ব্যক্তি এ দাবি অস্বীকার করেছেন।
ঘটনার পর থেকে এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় বিপর্যস্ত পল্লবী
মিরপুরের পাশাপাশি পল্লবীতেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সম্প্রতি পলাশনগর এলাকায় সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং একটি বেকারি ও এমব্রয়ডারি কারখানায় হামলা চালায়। কয়েক দিনের ব্যবধানে একই এলাকায় আবারও হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, লুটপাট এবং সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট করার অভিযোগ ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীদের হাতে চাপাতিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ছিল। তারা কারখানায় হামলার পাশাপাশি পথচারীদের মারধর করে মোবাইল ফোন ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেয়।
এই ধারাবাহিক হামলার পর নিরাপত্তার অভাবে অন্তত সাতটি কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
‘ভইরা দে’ ও ‘বাহুবালি’ গ্রুপের দাপট
মিরপুরে সক্রিয় একাধিক কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে ‘ভইরা দে’ ও ‘বাহুবালি’ নামে দুটি গ্রুপ নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি।
গত জুনে প্রান্তিক হাউজিং এলাকায় ‘ভইরা দে’ গ্রুপের কয়েক ডজন সদস্য প্রকাশ্যে তাণ্ডব চালায়। অন্যদিকে মিরপুর-১০ এলাকার একটি পরিত্যক্ত ভবনকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে ‘বাহুবালি’ গ্রুপ। এর আগেও এই গ্রুপের বিরুদ্ধে ছিনতাই ও হত্যার অভিযোগ ওঠে। তবে অভিযুক্তদের অনেকেই এখনও আইনের আওতার বাইরে রয়েছে।
ছিনতাইকারীদের টার্গেটে ব্যাংক থেকে ফেরা মানুষ
শুধু কিশোর গ্যাং নয়, পেশাদার ছিনতাইকারী চক্রও সক্রিয় রয়েছে মিরপুরে।
সম্প্রতি ব্যাংক থেকে ১৫ লাখ টাকা তুলে ফেরার পথে এক প্রতিষ্ঠানের কর্মী মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
এ ধরনের ঘটনার কারণে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা উত্তোলনের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বেড়েছে।
পরিসংখ্যানেও অপরাধ বৃদ্ধির চিত্র
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে মিরপুর বিভাগে ২২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একই সময়ে তেজগাঁও বিভাগে হত্যার সংখ্যা ছিল ১৫টি। এছাড়া ডাকাতির ঘটনাতেও মিরপুর এগিয়ে রয়েছে।
যদিও ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মামলার সংখ্যা তেজগাঁও বিভাগে তুলনামূলক বেশি, তবুও সামগ্রিকভাবে মিরপুরে সংঘবদ্ধ অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
পুলিশের বক্তব্য
পুলিশের দাবি, মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় বিপুলসংখ্যক ভাসমান মানুষের বসবাস এবং কিছু সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
ডিএমপি জানিয়েছে, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং কিশোর গ্যাং দমনে বিশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে।
নিরাপত্তা জোরদারের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অপরাধের ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও অনেক এলাকায় নিয়মিত টহল ও নজরদারির ঘাটতি রয়েছে।
তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ জোরদার, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান এবং সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় রাজধানীর এই জনবহুল এলাকায় অপরাধ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক রূপ নিতে পারে।
