জয়পুরহাট প্রতিনিধি: জন্মের পর থেকেই দুই পা অস্বাভাবিকভাবে বাঁকা। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না, এমনকি দৈনন্দিন অনেক কাজেও তাকে নির্ভর করতে হয় মায়ের ওপর। তবুও থেমে নেই জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার আওলাই ইউনিয়নের মাকুল গ্রামের সাত বছর ১০ মাস বয়সী শিশু কাফি। প্রতিদিন কখনো মায়ের সহায়তায়, আবার কখনো নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে কষ্ট করে পৌঁছে যায় স্কুলে। জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও থামাতে পারেনি তার লেখাপড়া করার স্বপ্নকে।
কাফি স্থানীয় শাইলট্টি রায়গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুলের পাশাপাশি নিয়মিত প্রাইভেটেও যায়। প্রতিটি পথচলাই তার জন্য কঠিন হলেও শিক্ষা অর্জনের আগ্রহে কোনো ভাটা পড়েনি।
কাফির বাবা মন্টু মিয়া একজন ভ্যানচালক। মা কোহিনুর বেগম গৃহিণী। জন্মের পর থেকেই ছেলের চিকিৎসার জন্য তারা উপজেলা, জেলা এবং ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল) পর্যন্ত ছুটেছেন। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের চেন্নাইয়ে (মাদ্রাজ) যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় ১০ লাখ টাকার চিকিৎসা ব্যয় বহন করার সামর্থ্য না থাকায় সেই চিকিৎসা আর করানো সম্ভব হয়নি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ছেলের সুস্থতার আশায় তারা চিকিৎসক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের বিকল্প চিকিৎসাও করিয়েছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উন্নত চিকিৎসার স্বপ্ন আজও অধরাই রয়ে গেছে।
কাফির মা কোহিনুর বেগম বলেন, “ছেলেটা যখন জন্ম নেয়, তখন খুব ভেঙে পড়েছিলাম। পরে নিজেকে বুঝিয়েছি—সন্তান যেমনই হোক, সে তো আমারই। অনেক চেষ্টা করেছি চিকিৎসার, কিন্তু টাকার অভাবে আর এগোতে পারিনি।”
বাবা মন্টু মিয়া বলেন, “আমি চাই আমার ছেলে লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হোক। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করছি। কিন্তু যদি চিকিৎসাটা করাতে পারতাম, তাহলে হয়তো ওর জীবনটাই বদলে যেত। একজন ভ্যানচালকের পক্ষে ১০ লাখ টাকা জোগাড় করা সম্ভব নয়।”
শাইলট্টি রায়গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সায়েলা বেগম চৌধুরী বলেন, “কাফি অত্যন্ত মেধাবী, ভদ্র ও প্রাণবন্ত একটি শিশু। সহপাঠীরাও তাকে আপন করে নিয়েছে। ক্লাসে যাওয়া, সিঁড়ি ওঠানামা কিংবা অন্যান্য কাজে বন্ধুরা তাকে সহযোগিতা করে। ওর শেখার আগ্রহ সত্যিই অনুকরণীয়।”
প্রতিদিনের প্রতিটি পদক্ষেপে কাফিকে লড়তে হয় শারীরিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে। তবুও তার চোখে একটাই স্বপ্ন—লেখাপড়া করে একদিন প্রতিষ্ঠিত হওয়া। প্রয়োজন শুধু সময়মতো উন্নত চিকিৎসা আর সমাজের সহানুভূতিশীল মানুষের সহযোগিতা। সেই সহায়তা মিললে জন্মগত প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে কাফিও একদিন হতে পারে অনুপ্রেরণার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আমার বাঙলা/ রাব্বি
