দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রি-পেইড ও স্মার্ট বিদ্যুৎ মিটারের গ্রাহকদের মধ্যে অস্বাভাবিক বিল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকের অভিযোগ, দৈনন্দিন বিদ্যুৎ ব্যবহারে বড় ধরনের পরিবর্তন না থাকলেও রিচার্জের টাকা আগের তুলনায় অনেক দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে মাসিক বিদ্যুৎ ব্যয় দ্বিগুণ, এমনকি কোথাও কোথাও তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর থেকে আসা অভিযোগে দেখা যাচ্ছে, একই ধরনের ব্যবহার বজায় রেখেও অনেক পরিবারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন।
রিচার্জের টাকা কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফরিদ খান জানান, গত কয়েক বছর ধরে তার মাসিক বিদ্যুৎ ব্যয় মোটামুটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই ছিল। কিন্তু সম্প্রতি একই ব্যবহার বজায় রেখেও কয়েক দিনের ব্যবধানে কয়েক হাজার টাকার রিচার্জ শেষ হয়ে গেছে। তার ভাষায়, বাস্তব ব্যবহারের সঙ্গে বিলের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাও। তিনি বলেন, কয়েক হাজার টাকা রিচার্জ করার মাত্র তিন দিনের মধ্যেই অধিকাংশ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। আগে যেখানে পুরো মাসে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যয় হতো, এখন তার বড় অংশ কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
একই ব্যবহার, কিন্তু বিল কয়েক গুণ বেশি
বহু গ্রাহকের দাবি, বাড়িতে নতুন কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র যোগ হয়নি, ব্যবহারের ধরণও অপরিবর্তিত রয়েছে। তারপরও মাসিক খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
কেউ কেউ জানান, আগে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকার বিদ্যুৎ বিল দিয়ে মাস পার হয়ে যেত। বর্তমানে একই পরিবারের জন্য তিন থেকে চার হাজার টাকারও বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে সংসারের অন্যান্য খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন ডিজিটাল ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি কেবল সাধারণ কারিগরি ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ডিজিটাল মিটারের সফটওয়্যার, কনফিগারেশন, ওভার রিডিং কিংবা বিলিং সিস্টেমে কোনো ধরনের ত্রুটি বা অনিয়ম রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করা উচিত।
তাদের মতে, অতীতে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে ডিজিটাল ব্যবস্থাতেও যদি একই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় গ্রাহকদের আস্থা আরও কমে যাবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের অবস্থান
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। দেশের সব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিকে গ্রাহকদের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনো গ্রাহক যেন অযৌক্তিক বিল বা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তির বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
যেভাবে অভিযোগ করবেন
অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল বা প্রি-পেইড মিটারে দ্রুত টাকা কেটে যাওয়ার ঘটনা ঘটলে গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসে সরাসরি যোগাযোগ অথবা নির্ধারিত কল সেন্টারে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের হটলাইন নম্বরসমূহ:
বিদ্যুৎ বিভাগের কেন্দ্রীয় সেবা: ১৬৯৯৯
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি): ১৬২০০
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (পবিবো): ১৬৮৯৯
ডিপিডিসি: ১৬১১৬
ডেসকো: ১৬১২০
নেসকো: ১৬৬০৩
ওজোপাডিকো: ১৬১১৭
গ্রাহকদের প্রত্যাশা
বিদ্যুৎ গ্রাহকদের দাবি, শুধু অভিযোগ গ্রহণ করলেই হবে না; প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিল নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, ডিজিটাল মিটারের নির্ভুলতা এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এমন অভিযোগ অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
