অবতরণিকা:
ময়মনসিংহ জেলার মোমেনসিং পরগণা এলাকায় একসময় দত্তনন্দী বংশের জমিদারি ও ব্যাপক প্রভাব ছিল। এ অঞ্চলের প্রাচীন ও সুস্পষ্ট ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্যে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে অবস্থিত ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি অ্যান্ড লাইব্রেরি এবং দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স নামে সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিহাসের অজানা অধ্যায় উন্মোচনের উদ্দেশ্যে সংগঠনগুলো অপ্রকাশিত তথ্য, জনশ্রুতি, প্রবীণ মানুষের স্মৃতিচারণ, ঝরে পড়া ইতিহাস, প্রাচীন দুর্লভ দলিল এবং মানচিত্র সংগ্রহ ও গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাসকে হালনাগাদ করার কাজ পরিচালনা করছে। প্রামাণ্য দলিল হিসেবে এসিক এসোসিয়েশন ও ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশনের সহযোগিতায় প্রতিবছর প্রকাশিত হয় আঞ্চলিক তথ্যবহুল স্বনামধন্য ম্যাগাজিন ‘পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স’। এ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রায় আড়াইশ বছর আগের রেনেলের মানচিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তৎকালীন মোমেনসিং পরগণার অন্তর্গত বর্তমান নেত্রকোনার আটপাড়া ও কেন্দুয়া উপজেলার দিকে তেলিগাতী ও রামপুর নামে প্রাচীন জনপদ বা প্রসিদ্ধ স্থান হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে তেলিগাতী একটি ইউনিয়নের নাম। এ ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি প্রসিদ্ধ গ্রাম রয়েছে। তন্মধ্যে মঙ্গলসিদ্ধ গ্রামে ছিল দত্তনন্দী বংশের প্রধান জমিদারবাড়ি। এছাড়া, বর্তমান ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার দত্তগ্রাম এলাকায় তাদের আত্মীয়-স্বজনের কিছু তথ্য সন্ধান পাওয়া যায়। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, গৃহবিবাদ ও স্বার্থসংঘাতের কারণে একপর্যায়ে এই বংশের সুখ-শান্তি নষ্ট হয় এবং নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে তাদের জমিদারি বাজেয়াপ্ত করা হয়। জমিদার শ্রী শৌরীন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী রচিত ১৯১১ সালে প্রকাশিত ‘ময়মনসিংহের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদার’ গ্রন্থে দত্তনন্দীদের জমিদারির সংক্ষিপ্ত বিবরণ উল্লেখ রয়েছে।
দত্তনন্দী জমিদারির ইতিহাস সম্পর্কে গ্রন্থে উল্লেখিত কিছু উদ্ধৃতি নিচে তুলে ধরা হলো—” ঈশা খাঁ পূর্বে এই মোমিনসাহী পরগণার অধিকারী ছিলেন। কালক্রমে সপ্তদশ শতাব্দীতে এই জমিদারি মঙ্গলসিদ্ধ গ্রাম নিবাসী দত্ত বংশীয়দিগের অধিকারগত হয়। দত্ত বংশীয়েরাই কিছুদিন পরগণার অধিকারী ছিলেন। কালক্রমে রামপুরের নন্দী বংশীয় কোন ব্যক্তি দত্ত বংশে বিবাহ করিয়া বিবাহের যৌতুক স্বরূপ এই জমিদারির ১/৬ অংশ প্রাপ্ত হন।”
বগুড়ার ব্রাহ্মণ জমিদার শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী মোমেনসিং পরগনার অধিকার লাভের পূর্বে এ অঞ্চলে ছিল দত্ত নন্দী বংশীয় জমিদারদের প্রভাব ও জমিদারি:
বগুড়ার কড়ই রাজবাড়ির ব্রাহ্মণ রাজা শ্রীকৃষ্ণ তলাপাত্র বা শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী মোমেনসিং পরগণার অধিকার লাভের পূর্বে এই অঞ্চলে দত্ত–নন্দী বংশের জমিদারি ও প্রভাব ছিল। মধ্যযুগ ও মুঘল আমলে এ অঞ্চল ভাটি বাংলার রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, সামরিক প্রতিরোধ এবং পরবর্তী জমিদারি ব্যবস্থার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্থানীয় ইতিহাস, বংশপঞ্জি, মৌখিক ঐতিহ্য ও আঞ্চলিক গবেষণালব্ধ তথ্যের আলোকে মোমেনসিং পরগণার মালিকানা ও জমিদারি উত্তরাধিকারের একটি ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায়। দিল্লির মুঘল সম্রাটের নির্দেশে বাংলার নবাব মুর্শিদ কুলি খান তার বিশ্বস্ত কর্মচারী শ্রীকৃষ্ণ তলাপাত্রকে “চৌধুরী” উপাধি প্রদান করেন এবং মোমেনসিং পরগণার জায়গীর দান করেন। এরপর তিনি শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী নামে পরিচিত হন। সে সময় বৃহত্তর ময়মনসিংহের সরকার বাজুহার অন্তর্গত বিশাল মোমেনশাহী পরগণা ঈশ্বরগঞ্জ এলাকার হোসেনশাহী পরগণার সীমানা থেকে সুনামগঞ্জ অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। এর আগে এ অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঈশা খাঁ-এর শাসনের ইতিহাস। ষোড়শ শতাব্দীতে বাংলার বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম প্রধান নেতা ও ভাটি অঞ্চলের শাসক ঈশা খাঁর কর্তৃত্ব এ অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল । পরবর্তীকালে আফগান বংশোদ্ভূত সেনাপতি খাজা উসমান খানও এ অঞ্চলে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলেন। স্থানীয় ঐতিহ্যে গৌরীপুরের বোকাইনগরকে তার প্রশাসনিক কেন্দ্র বা রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ১৬১১ সালে মুঘলদের সঙ্গে সংঘর্ষে খাজা উসমানের পতনের পর মোমেনশাহী অঞ্চল ধীরে ধীরে মুঘল শাসনের আওতায় আসে। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর-এর আমলে বোকাইনগর মুঘলদের নিয়ন্ত্রণে এলে সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের আত্মীয় বীরাঙ্গনা সখিনার পিতা দেওয়ান উমর খাঁ (ওমর খাঁ) মোমেনসিং পরগণার অধিকার লাভ করেন এবং গৌরীপুরের কেল্লা তাজপুর গ্রামে তাজপুরকেন্দ্রিক দেওয়ান বংশের উত্থান ঘটে এবং কেল্লা তাজপুর ছিল তার রাজধানী।
কালক্রমে সপ্তদশ শতাব্দীতে এই জমিদারি নেত্রকোনার আটপাড়া অঞ্চলের মঙ্গলসিদ্ধ গ্রামের দত্ত বংশীয়দের হাতে আসে। পরবর্তীতে কেন্দুয়া উপজেলার রামপুরের নন্দী বংশের এক ব্যক্তির সঙ্গে দত্ত বংশে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে যৌতুক হিসেবে জমিদারির ছয় আনা অংশ নন্দী বংশের অধিকারে আসে। সুতরাং বলা যায়, মোমেনসিং পরগণার ইতিহাস কেবল জমিদারি উত্তরাধিকারের ইতিহাস নয়; বরং এটি পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তন, মুঘল প্রশাসনিক রূপান্তর, আঞ্চলিক ক্ষমতা কাঠামো এবং স্থানীয় বংশীয় ঐতিহ্যের একটি জটিল ও বহুস্তরীয় ঐতিহাসিক উপাখ্যান।
দত্ত নন্দী বংশীয়দের আমলে মোমেনসিং বা ময়মনসিংহ পরগনার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থাঃ
দত্ত নন্দী বংশীয় জমিদারদের আমলে মোমেনসিং পরগণার (বর্তমান বৃহত্তর ময়মনসিংহের পূর্ব অঞ্চলের অংশবিশেষ) আর্থ-সামাজিক ও ভৌগোলিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে অনুন্নত ছিল সে সময় পরগণার বিস্তীর্ণ এলাকা জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল দ্বারা আচ্ছাদিত থাকায় স্থায়ী জনবসতি সীমিত ছিল এবং বহু ভূমি অনাবাদি বা পতিত অবস্থায় পড়ে থাকত। কৃষিজ উৎপাদনব্যবস্থা ছিল প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর অধিক নির্ভরশীল এবং খাজনার হারও ছিল অপেক্ষাকৃত নিম্ন।
তৎকালীন সময়ে কোচ, হাজং, গারো, ভূটিয়া প্রভৃতি বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বসতি এ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য ছিল। সীমিত চাহিদাভিত্তিক জীবনযাত্রা এবং স্বল্প পরিশ্রমে অর্জিত কৃষিপণ্যে সন্তুষ্ট থাকার প্রবণতা তাদের সামাজিক জীবনের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থনৈতিক কাঠামো ছিল অপেক্ষাকৃত বিনিময়ভিত্তিক; হাট-বাজারে ধাতব মুদ্রার ব্যবহার সীমিত থাকায় কড়ি ও শস্য বিনিময়ের মাধ্যমে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় পরিচালিত হতো। ফলে নগদ অর্থের প্রবাহ ছিল সীমিত, যা জমিদারদের জন্য নিয়মিত খাজনা আদায়কে জটিল করে তুলত। অনেকেই খাজনা না দিয়ে গুপ্তভাবেই চাষ আবাদ করত, জমিদার তা জানতে পারত না। এইরূপ নানা কারণে ময়মনসিংহ পরগণার জমিদারি তখন বিশেষ লাভজনক ছিল না।
এ প্রসঙ্গে রামগোপালপুরের জমিদার সৌরীন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী তাঁর স্মৃতিকথায় জমিদারি ব্যবস্থার আর্থিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে,” নবাব সরকারের নিয়মিত রাজস্ব ও উপহারাদি প্রদানান্তে যা কিছু অর্থ উদ্বৃত্ত হইত, তদ্বারা জমিদারগণ নিত্য নৈমিত্তিক ক্রিয়াকলাপ এবং সম্ভ্রমোচিত অন্যান্য ব্যয়জনক কার্য সম্পাদন করিয়া অতি অল্প লাভ পাইতেন। অর্থের প্রচুরতা না থাকিলেও তাহাদের মান মর্যাদা যথেষ্ট ছিল। প্রজাগণ জমিদারকে দেবতাতুল্য জ্ঞান করিত, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে জমিদারের তুষ্টি সাধন জন্য প্রজা-সাধারণের বিশেষ আগ্রহ ছিল। মাসিক বেতনে চাকর ছিল না। চাকরান জমির প্রথা ছিল। খানসামা, পরিচালক, কৃষক, লাঠিয়াল, পাইক, ধোপা, নাপিত, দপ্তরী, মশালচী, মালী ও সূত্রধর প্রভৃতি সকলেরই পরিজন পোষণের জন্য উপযুক্ত পরিমাণ জমি নির্দিষ্ট ছিল। সর্বপ্রকার কার্যে প্রজা সাধারণের সহানুভূতি ও সাহায্য ছিল। সুতরাং আর্থিক অবস্থা তত ভাল না হইলেও জমিদারদের সুখেশ্বর্য্যের অভাব ছিল না।” তবে উল্লেখ্য, এ ধরনের বিবরণ মূলত জমিদার-স্মৃতিকথা ও স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক উৎস থেকে পাওয়া; ফলে এগুলোর মূল্যায়নে সমকালীন প্রশাসনিক দলিল, রাজস্ব নথি ও বহুমাত্রিক ঐতিহাসিক সূত্রের তুলনামূলক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ।
মোমেনসিং পরগণায় দত্তনন্দী জমিদার বংশের পতনের সূত্রপাত
মোমেনসিং পরগণায় দত্তনন্দী বংশীয় জমিদারদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বিদ্যমান ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও স্বচ্ছল অবস্থানে ছিলেন । তবে বাংলার প্রশাসনিক ও রাজস্ব কাঠামোয় পরিবর্তনের ফলে তাদের জমিদারির ওপর ক্রমে চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশেষত, বাংলার সুবেদার মুর্শিদকুলি খাঁ নবাব হিসেবে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রাজস্ব ব্যবস্থায় কঠোরতা আরোপ করা হয়। নতুন রাজস্বনীতি ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রভাব অনেক আঞ্চলিক জমিদার পরিবারের মতো দত্তনন্দী বংশের ওপরও পড়ে। একই সময়ে পরিবারে একাধিক অংশীদার বা শরিকের উপস্থিতি জমিদারি পরিচালনায় বিভাজন ও মতবিরোধ সৃষ্টি করে। বিভিন্ন শরিকের মধ্যে জমিদারির কর্তৃত্ব, সম্পদ বণ্টন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় প্রজাদের কাছ থেকে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে অর্থ আদায় কিংবা গোপন খাজনা সংগ্রহের অভিযোগেরও উল্লেখ রয়েছে; যদিও এসব তথ্যের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের জন্য অধিকতর প্রামাণ্য দলিল যাচাই প্রয়োজন। ফলে জমিদারি প্রশাসনে শৃঙ্খলা দুর্বল হতে থাকে এবং পারিবারিক বিরোধ ক্রমে তীব্র আকার ধারণ করে। দত্তনন্দী বংশের পতনের পেছনে কেবল বাহ্যিক প্রশাসনিক চাপই নয়, বরং অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, শরিকানা দ্বন্দ্ব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এই আত্মকলহ ও সাংগঠনিক দুর্বলতাই পরবর্তীকালে মোমেনসিং পরগণায় তাদের প্রভাব হ্রাসের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
মোমেনসিং পরগণার দত্তনন্দী বংশের ক্ষমতার অবনতির কারণসমূহ
মোমেনসিং পরগণায় দত্তনন্দী বংশের জমিদারি কর্তৃত্বের অবনতির পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণ কার্যকর ছিল । তাদের শাসনামলের এক পর্যায়ে ময়মনসিংহ অঞ্চলে ভয়াবহ জলপ্লাবন সংঘটিত হয়, যার ফলে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল বিনষ্ট হয় এবং বিপুল সংখ্যক গৃহপালিত পশুর মৃত্যু ঘটে। এর ধারাবাহিকতায় এলাকায় দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, যা জনজীবনে গভীর সংকট সৃষ্টি করে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মোমেনসিং পরগণার বহু প্রজা এলাকা ত্যাগে বাধ্য হয় এবং অধিকাংশ কৃষক খাজনা প্রদানে অক্ষম হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, পরপর দুই বছর জমিদারদের পক্ষে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়। প্রথম বছরে নবাব সরকারের নির্ধারিত রাজস্বের একটি অংশ বকেয়া থেকে যায়। সে সময় মুর্শিদাবাদে দত্তনন্দীদের প্রতিনিধি ও বিশ্বস্ত মোক্তার ভৃগুরাম দেব পরিস্থিতির বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে সাময়িক অব্যাহতি লাভে সক্ষম । কিন্তু পরবর্তী বছরেও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় রাজস্ব আদায় কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে। একই সময়ে জমিদার পরিবারের বিভিন্ন শরিকের মধ্যে গৃহবিরোধ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করে। রাজস্ব প্রদানের দায়ভার গ্রহণে কেউ অগ্রসর না হওয়ায় এক বছরের সম্পূর্ণ রাজকর বকেয়া পড়ে যায়। এই অবস্থায় মোক্তার ভৃগুরাম দেব রাজস্ব বিভাগের কর্মচারীদের মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় সংগ্রহের উদ্যোগ নেন এবং রাজস্ব পরিশোধের জন্য ছয় মাসের অবকাশ আদায় করেন বলে বর্ণিত আছে। এদিকে বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁঅনাদায়ী রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে কঠোর নীতি গ্রহণ করেন। দত্তনন্দী বংশীয় জমিদারদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা প্রদান করা হয় যে, ভবিষ্যতেও রাজস্ব প্রদানে অবহেলা অব্যাহত থাকলে তাদের জমিদারি অধিকারের ওপর হুমকি সৃষ্টি হতে পারে। এই সতর্কতাই দত্তনন্দী শরিকদের মধ্যে নতুন উদ্বেগের জন্ম দেয়।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে জমিদারগণ পুনরায় রাজস্ব সংগ্রহে সক্রিয় হন। বিভিন্ন উপায়ে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করে তা উপযুক্ত প্রতিনিধি ও লোকবলসহ নৌপথে মুর্শিদাবাদে প্রেরণের ব্যবস্থা করা হয়। তবে এ ঘটনাপ্রবাহ দত্তনন্দী বংশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতার সূচনাকাল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা পরবর্তীকালে তাদের জমিদারি ক্ষমতার অবক্ষয়ের পথ প্রশস্ত করে।
দত্তনন্দীদের প্রতিকূল পরিস্থিতি ও জলদস্যু কর্তৃক রাজস্ব লুণ্ঠনের ঘটনা:
দত্তনন্দী বংশের জমিদারি সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রাজস্ব প্রেরণকালে সংঘটিত লুণ্ঠনের ঘটনা, যা তাদের আর্থিক ও প্রশাসনিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তোলে। রাজস্ব বকেয়া পরিশোধের লক্ষ্যে দত্তনন্দীরা বিপুল প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে তা নৌপথে মুর্শিদাবাদে প্রেরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু যাত্রাপথে প্রেরিত রাজস্ব জলদস্যুদের আক্রমণের মুখে পড়ে এবং লুণ্ঠিত হয় । এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দত্তনন্দী পক্ষ নবাব সরকারের নিকট নিজেদের দুর্দশা ও প্রতিকূল অবস্থার বিবরণ উপস্থাপন করেছিলেন বলে জানা যায়। তারা দাবি করেন যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ, প্রজাদের খাজনা প্রদানে অক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার পাশাপাশি জলদস্যুদের হাতে রাজস্ব লুণ্ঠনের ঘটনাও তাদের আর্থিক সংকটকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। ফলে নির্ধারিত সময়ে রাজস্ব পরিশোধ তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
রাজস্ব লুণ্ঠনের ঘটনায় নবাবের অবিশ্বাস ও তদন্ত নির্দেশ:
দত্তনন্দী জমিদারদের প্রেরিত রাজস্ব জলদস্যু কর্তৃক লুণ্ঠিত হওয়ার সংবাদ পরবর্তীকালে মুর্শিদাবাদের নবাবি দরবারে পৌঁছায়। তবে বাংলার নবাব এই সংবাদকে প্রথমদিকে বিশ্বাসযোগ্য বলে গ্রহণ করেননি। ঐ সময় প্রায় তিন বছরের রাজস্ব বকেয়া থাকায় নবাবের ধারণা জন্মে যে, বকেয়া কর আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে দত্তনন্দীরা লুণ্ঠনের ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ফলস্বরূপ, তিনি দত্তনন্দী বংশের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং তাদের প্রতিনিধিদের প্রতিও বিরূপ মনোভাব প্রদর্শন করেন। দত্তনন্দীদের পক্ষে নিয়োজিত উকিল বা মোক্তার ভৃগুরাম দেব নবাবি দরবারে বিশেষ তিরস্কারের সম্মুখীন হন। তিনি রাজস্ব লুণ্ঠনের ঘটনার সত্যতা প্রমাণে বিভিন্ন সাক্ষ্য ও দলিল উপস্থাপন করে নবাবের অনুকম্পা কামনা করেন এবং ঘটনার যথাযথ অনুসন্ধানের জন্য একাধিকবার আবেদন জানান। কিন্তু দত্তনন্দীদের দুর্ভাগ্যক্রমে তার এসব প্রচেষ্টা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে সক্ষম হয়নি। পরবর্তীকালে নবাব ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে তদন্তের নির্দেশ প্রদান করেন। তবে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ বা নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ছাড়াই তিনি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার কেল্লা বোকাইনগরের শাসনকর্তা মীর্জা বাখর ওয়াদেদারের নিকট তদন্তের জন্য একটি আদেশ প্রেরণ করেন। এই পদক্ষেপ দত্তনন্দীদের ভাগ্য নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পর্ব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দত্তনন্দী বংশীয়দের আত্মকলহ ও বোকাইনগরের শাসনকর্তার আচরণ:
মোমেনসিং পরগণার দত্তনন্দী বংশের জমিদারির পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও প্রশাসনিক প্রতিকূলতাকে চিহ্নিত করা হয়। সমকালীন বিবরণে জানা যায়, সিন্ধা পরগণার এক মুসলমান জমিদার কেল্লা বোকাইনগরের শাসনকর্তা মীর্জা বাখর ওয়াদেদারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। অপরদিকে, দত্তনন্দী বংশীয় জমিদাররা তখন পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও সম্পত্তিগত বিরোধে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। রাজস্ব লুণ্ঠনের ঘটনার সংবাদ পৌঁছানোর পর দত্তনন্দী পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হলেও তারা সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থ হন। বরং পারস্পরিক দোষারোপ ও সমালোচনার ফলে বিবাদ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ঐক্যের অভাব ও বিচ্ছিন্নতার কারণে জমিদারির প্রশাসনিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি জমিদারি সম্পত্তির অংশ বণ্টন নিয়ে পরিবারের কয়েকজন অংশীদার কেল্লা বোকাইনগরের শাসনকর্তার নিকট পৃথক আবেদন করেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে জমিদার শ্রী শৌরীন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী রচিত ময়মনসিংহের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদার (১৯১১) গ্রন্থে দত্তনন্দীদের জমিদারির সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে আত্মকলহের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তথ্যানুসারে,দত্ত নন্দীদের জমিদারির আত্মকলহ সম্বন্ধে তার কিছু উদ্ধৃতি দেওয়া হলো – ‘‘রাজস্ব লুণ্ঠন সম্বন্ধে বিচারের ভার উক্ত শাসনকর্তার প্রতি অর্পিত হওয়ায় তিনি ইহা প্রকৃত বলিয়া বোধ করিলেন না। তিনি নবাবকে জানাইলেন, “দত্তনন্দী বংশীয় জমিদারদের মধ্যে আত্ম–কলহ উপস্থিত হইয়াছে, সম্পত্তির অংশীদারেরা নিজ নিজ স্বার্থ চিন্তায় ব্যাপৃত। সম্পত্তি বিভাগের জন্য আমার নিকট ৩/৪ জন অংশী প্রার্থনা করিয়াছে। প্রজাদের নিকট খাজনা আদায় হয় নাই। ইহারা খাজনা পাঠাইয়াছে, ইহা বিশ্বাসযোগ্য নহে। ভবিষ্যতেও যে ইহারা উচিত মত রাজস্ব দিতে পারিবে তাহারও সম্ভাবনা নাই। সিন্ধা পরগণার মুসলমান জমিদার বড়ই কার্যদক্ষ ও বিশ্বাসী, বাকি রাজস্ব ছাড়িয়া দিলে উক্ত জমিদার ময়মনসিংহ পরগণার কর আদায়ের ভার গ্রহণ করিতে পারে।“
দত্ত নন্দীদের পতন ও শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী ময়মনসিংহ পরগনায় আগমনঃ
দত্ত নন্দী বংশীয় জমিদারদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, অংশীদারদের আত্মকলহ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংকট একপর্যায়ে তাদের জমিদারির ভিত্তিকে দুর্বল করে তোলে। বোকাইনগরের কেল্লাদার মীর্জা বাখর ওয়াদেদারের প্রচলিত বর্ণনা অনুসারে, চিঠির বিবরণ শুনে বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং দত্ত নন্দীদের পক্ষ থেকে প্রেরিত মোক্তার ভৃগুরামকে কারারুদ্ধ করার নির্দেশ দেন । একই সঙ্গে কেল্লাদার মীর্জা বাখর ওয়াদেদারের অনুরোধে সিন্ধা পরগণার রাজস্ব আদায় ও অনাদায়ের হিসাব পর্যালোচনা করা হয়। নবাব প্রশাসন সংশ্লিষ্ট জমিদারদের অযোগ্য বিবেচনা করে বিকল্প ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয় । এই প্রেক্ষাপটে, নবাব আমলে কিছু জমিদারদের বিদ্রোহ দমন ও প্রশাসনিক আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ তলাপাত্রকে ময়মনসিংহ পরগণার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। পরবর্তীকালে তিনি ‘চৌধুরী’ উপাধিতে ভূষিত হন এবং আনুমানিক ১১২৫ বঙ্গাব্দে (১৭১৭ অথবা প্রায় ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দ) ময়মনসিংহ পরগণার জমিদারির ফরমান লাভ করেন । এই প্রসঙ্গে জমিদার শ্রী শৌরীন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বলেন, ‘তখন নবাব শ্রীকৃষ্ণকে শেষ হুকুম দিয়া ‘চৌধুরি‘ উপাধি প্রদান করিলেন ও আনুমানিক ১১২৫ বঙ্গাব্দে ময়মনসিংহ পরগণার জমিদারি ফরমান প্রদান করিলেন‘। ‘এর মাধ্যমে তিনি মোমেনসিং পরগণার নতুন জমিদার হিসেবে বোকাইনগর অভিমুখে যাত্রা করেন এবং পরবর্তীকালে শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী তলাপাত্র বা শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী নামে পরিচিতি লাভ করেন। স্থানীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার বোকাইনগর ইউনিয়নের ‘বাসাবাড়ি’ নামে পরিচিত রাজবাড়িটি শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরীর আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিন শতাব্দী পুরোনো এই স্থাপনাটি এখনও স্থানীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে টিকে রয়েছে।
সবশেষে, পারিবারিক স্বার্থসংঘাত, গৃহ-বিবাদ এবং প্রশাসনিক অস্থিরতার ফলে দত্ত নন্দী বংশীয়দের জমিদারি ক্ষমতা ধ্বংস হয়। ইতিহাসভিত্তিক সূত্রে জানা যায় যে, নবাবি আমলে তাদের জমিদারি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে সেই জমিদারির দায়িত্ব শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী তলাপাত্রের হাতে ন্যস্ত হয়।
তথ্য সূত্র:
১. ময়মনসিংহের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদার— শ্রী শৌরীন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী (রামগোপালপুর এস্টেট এর জমিদার ও রাজা যোগেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর ৩য় পুত্র)
২. ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ— শ্রী কেদারনাথ মজুমদার
৩. ময়মনসিংহের জমিদারি ও ভূমিস্বত্ব— মো. হাফিজুর রহমান ভূঞা
৪. ব্রিটিশ ভূবিদ মেজর জেমস রেনেলের অংকিত কয়েকটি মানচিত্র
৫. সিরাজের পুত্র ও বংশধরদের সন্ধানে— ভারত উপমহাদেশের অন্যতম কৃতি ইতিহাসবিদ ও প্রফেসর ড. অমলেন্দু দে
৬. নেত্রকোণা জেলার ইতিহাস— আলী আহম্মদ খান আইয়োব
৭. উইকিপিডিয়ার তথ্য (৮) বাংলাপিডিয়ার তথ্য (৯) ম্যাগাজিন: পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স-২০২০, পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স-২০২১ ও ২০২২ , পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স ২০২৩ এরং পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স-২০২৪ ও ২০২৫
(১০) ইতিহাস অনুসন্ধানী সংগঠন কর্তৃক প্রতিবেদনে সহযোগিতা (এসিক এসোসিয়েশন, ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন, দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স, ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি এন্ড লাইব্রেরি, ক্রিয়েটিভ সন্ধানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্লাব ) (১১) ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন – দরজি আবদুল ওয়াহাব (১২) ময়মনসিংহের রাজপরিবার – আবদুর রশীদ। (13) A Description Of The Roads In Bengal And Bahar and A General Map of the Roads in Bengal (14) The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760- Richard M. Eaton (15) The History of British India- James Mill (16) The history of two forts in Gouripur, Mymensingh-Mohammad Raihan Uddin Sarker (Special issue on 38th anniversary of the New Nation, published on 19 June 2017). (17) David Rumsey Historical Map Collection. (18) New York Historical Society. (19) ১৯১৭ সালে F. A. Sachse এর সম্পাদিত Bengal District Gazetteers’ Mymensingh (20) ১৯০৫ সালে প্রকাশিত MYMENSINGH DISTRICT GAZETTEER. STATISTICS, 1901-02.
লেখক,সাংবাদিক, গবেষক ও ইতিহাস সন্ধানী
