বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের ছাত্রজীবন নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলেন তার বাবা। সম্প্রতি হকিংয়ের বাবার ৬০ বছর পুরানো এক গোপন ডায়েরির কোড বা সংকেত উদ্ধার করা গেছে, যেখানে তিনি আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ছেলের পড়াশোনায় মন নেই এবং সে কোনো উদ্যোগ ছাড়াই অলসভাবে ঘুরে বেড়ায়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, বিশ্বের জ্যামিতি ও পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার পথ ধরে স্টিফেন হকিং হয়ে উঠেছিলেন ব্ল্যাক হোল তত্ত্বের জনপ্রিয় পথপ্রদর্শক। তার লেখা তুমুল জনপ্রিয় বই ‘এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’ বিশ্বজুড়ে এক কোটি ৩০ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে, যা মানুষকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে ‘পাখির মতো মাটির দিকে তাকিয়ে না থেকে, আকাশের তারাদের দিকে তাকাতে’।
অথচ, হকিংয়ের ছাত্রজীবনে ও তার প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার দিনগুলোতে ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলেন তার বাবা ফ্র্যাঙ্ক হকিং।
সম্প্রতি আবিষ্কৃত ও গোপন কোড বা সংকেতে আংশিক লেখা ডায়েরিতে ফ্র্যাঙ্ক লিখেছিলেন, স্টিফেন কোনো উদ্যোগ ছাড়াই অলসভাবে ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় এবং পড়াশোনাতেও তেমন মন নেই।
‘কোস্টা পুরস্কার’ পাওয়া জীবনীকার গ্রাহাম ফারমেলো মানুষের জীবন নিয়ে লেখেন ও তিনি একজন পদার্থবিদও। তাকে হকিং পরিবারের সেই ব্যক্তিগত নথিপত্র ও আলোকচিত্রগুলো দেখার নজিরবিহীন সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এসব অজানা ডায়েরি।
‘জন মারে’ প্রকাশনা এ সপ্তাহেই ঘোষণা করতে যাচ্ছে, আগামী সেপ্টেম্বরে স্টিফেন হকিংয়ের এস্টেট বা উত্তরাধিকারীর মাধ্যমে অনুমোদিত তার প্রথম পূর্ণাঙ্গ জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ করতে যাচ্ছেন গ্রাহাম ফারমেলো।
তার এ গবেষণার অংশ হিসেবে ফারমেলোকে হকিংয়ের বাবার ডায়েরি থেকে শুরু করে মা ইসোবেলের চিঠিপত্র ও দিনলিপির মতো আগে কখনো সামনে না আসা বহু নথিপত্র দেখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতকাল যাবত এসব জিনিস সংরক্ষিত ছিল হকিংয়ের বোন মেরির বাড়িতে।
ফারমেলো বলেন, এসব ডায়েরি ও নথিপত্র দেখার সুযোগ পাওয়াটা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও দারুণ এক প্রাপ্তি। স্টিফেন হকিংয়ের জীবনের, বিশেষ করে তার গড়ে ওঠার দিনগুলো এবং কেবল ২১ বছর বয়সে যখন তার মোটর নিউরন রোগ ধরা পড়ে সেসব যন্ত্রণাদায়ক মাসের তথ্যের এক খাঁটি ভাণ্ডার এসব লেখা।
তিনি বলেন, এগুলো হকিংয়ের বড় হয়ে ওঠার দিনগুলো এবং ১৯৬৩ সালের সেই বিধ্বংসী রোগ নির্ণয়ের ক্ষণটিকে ‘স্পষ্ট ও অকপটে’ ফুটিয়ে তুলেছে। এ মারাত্মক ক্ষয়িষ্ণু রোগটি হকিংকে পরবর্তী সময়ে প্রায় সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দিয়েছিল।
চিকিৎসকদের সব পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে (যেখানে বলা হয়েছিল তিনি বড়জোর দুই বছর বাঁচবেন) হকিং ২০১৮ সালে ৭৬ বছর বয়সে মারা যান। ততদিনে কসমোলজি ও তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় যুগান্তকারী কাজ এবং মহাকাশ, সময় ও ব্ল্যাক হোলের রহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে তিনি নিজেকে এ সময়ের অন্যতম সেরা ও প্রবাদপ্রতিম বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।
হুইলচেয়ার ব্যবহার শুরুর সময় কেবল কম্পিউটার ও ভয়েস ‘সিন্থেসাইজার’ বা কৃত্রিম কণ্ঠস্বরের সাহায্যে যোগাযোগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন হকিং। এ সময় তার এসব অর্জন মানুষের কাছে আরও বেশি অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
হকিং নিজেই বলেন, জীবনকে এত সিরিয়াসলি না নিয়ে এর ভেতরের মজাটা খুঁজে নেওয়া উচিত। ২১ বছর বয়সে আমার সব প্রত্যাশা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। এরপর থেকে আমি যা কিছু পেয়েছি তার সবই এক একটি বোনাস বা বাড়তি পাওয়া। মনে রেখো, পাখির মতো মাটির দিকে তাকিয়ে না থেকে, আকাশের তারাদের দিকে তাকাবে। যা দেখছ তা বোঝার চেষ্টা করো ও এ মহাবিশ্ব কেন অস্তিত্বশীল তা নিয়ে ভাবো। কৌতুহলী হও। জীবন যতই কঠিন মনে হোক না কেন সবসময়ই এমন কিছু থাকে, যা তুমি করতে পারো ও যাতে সফল হওয়াও সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সহজেই হাল ছেড়ে না দেওয়া।
অথচ, ১৯৬১ সালের দিকে মৌসুমী রোগ বিশেষজ্ঞ ফ্র্যাঙ্ক হকিং নিজের ডায়েরিতে যখন ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে লিখছিলেন তখন কল্পনাতেও ভাবেননি যে তার ছেলে পরবর্তীতে কী অসামান্য সব অর্জন করতে যাচ্ছে।
ফ্র্যাঙ্ক লিখেন, স্টিভেনের দিনকাল যেভাবে কাটছে তা নিয়ে আমরা চিন্তিত। সে কোনো উদ্যোগ ছাড়াই অলসভাবে ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় এবং পড়াশোনাতেও তেমন মন নেই। ইসোবেল (স্টিভেনের মা) বলে, আমার প্রতি ওর এক ধরনের হীনম্মন্যতা কাজ করে, যার কোনো প্রয়োজনই নেই। অক্সফোর্ডে পদার্থবিজ্ঞানের ওপর থেকে ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। ওর মনে হচ্ছে বিষয়টি শিল্পকলার চেয়ে নিকৃষ্ট মানের। এমনটা খুবই দুঃখজনক। ওর বয়সে আমার মনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল, আমি যদি ওর মতো সুযোগ-সুবিধার অর্ধেকও পেতাম তবে আরও অনেক ভালো কিছু করতে পারতাম।
ফ্র্যাঙ্ক টানা ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডায়েরি লিখেছিলেন এবং এর অনেকগুলো পাতাই তিনি লিখেছিলেন গোপন কোড বা সংকেত ব্যবহার করে।
ফারমেলো সেই কোডের রহস্য উদঘাটন করতে পেরেছেন, যার মাধ্যমে তিনি হকিংয়ের শৈশব, তার অসুস্থতা, দুটি বিয়ে ও একজন বিশ্বমানের পদার্থবিদ হিসেবে তার ক্যারিয়ারের সঙ্গে জড়িত প্রায় দুই লাখেরও বেশি শব্দ অনুবাদ করেছেন।
ফ্র্যাঙ্ক লিখেন, এ দিনলিপিটি গ্রিক লিপিতে লেখা হয়েছে, যাতে সাধারণ গোপন কোড তৈরি করা যায় এবং ব্যক্তিগত প্রাইভেসি রক্ষা সম্ভব হয়। ডায়েরিটি কোনো শত্রুর হাতে বা সহজে কষ্ট পান এমন কাছের মানুষের হাতে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে প্রাইভেসি জরুরি। যেহেতু গ্রিক বর্ণমালায় সব ইংরেজি অক্ষর নেই, ফলে নিচে উল্লেখিত বিভিন্ন পরিবর্তন করা হল। এরপর তিনি এইচ, ভি, কিউইউ, ডব্লিউ ও জে অক্ষরের জন্য তৈরি বিভিন্ন কোড যোগ করেছেন।
এসব ডায়েরিতে স্পষ্ট প্রকাশ পেয়েছে, ছেলের ক্রমাগত ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ফ্র্যাঙ্ককে কতটা সংগ্রাম করতে হয়েছিল।
১৯৬৭ সালে ফাঙ্ক লিখেন, স্টিভেনের সঙ্গে সময় কাটানো আমার কাছে এক ধীর ও ভয়ানক অভিজ্ঞতা। সবকিছুই খুব কষ্টদায়কভাবে ধীরগতির ও দীর্ঘায়িত। ওর কথা বলা এতই ধীর ও বোঝা কঠিন যে, কথাবার্তা চালানো খুবই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ওর জন্য আমার খুব কষ্ট হয় এবং ওর জন্য যা কিছু করা সম্ভব আমি করব। তবে ওর সঙ্গে থাকাটা আমি মোটেও উপভোগ করি না।
ফারমেলোর ‘স্ট্রেঞ্জেস্ট ম্যান: দ্য হিডেন লাইফ অফ পল ডিরাক, কোয়ান্টাম জিনিয়াস’ নামের বইটি ২০০৯ সালে ‘কোস্টা জীবনী’ ও ‘এলএ টাইমস বুক’ পুরস্কার জিতেছিলেন। ব্রিটিশ পদার্থবিদ পল ডিরাক ছিলেন হকিংয়ের অন্যতম ব্যক্তিগত আদর্শ।
তার এ নতুন বইটির জন্য ফারমেলো হকিংয়ের পরিবারের সবচেয়ে কাছের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছেন তার দুই বোন মেরি ও ফিলিপা, প্রথম স্ত্রী জেন ও তিন সন্তান রবার্ট, লুসি ও টিম।
‘হকিং’ শিরোনামের এ জীবনীগ্রন্থটি আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ‘জন মারে’ প্রকাশনা থেকে প্রকাশ পাবে, যাকে তারা ‘অনন্য এক জীবন ও মেধার চূড়ান্ত প্রতিকৃতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
সাননিউজ/আরএ
