দেশে হাম ও উপসর্গে শিশুমৃত্যু থামছেই না। পরিস্থিতি ক্রমেই আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রোববার (২৪ মে) পর্যন্ত হামের উপসর্গে এবং নিশ্চিত হামে দেশে ৫২৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর বিশ্বে এটি হামে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গে আরও ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও উপসর্গে মারা গেছে ৫২৮ শিশু।
রোববার (২৪ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এদিকে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও হাম সংক্রমণ এড়াতে ঈদের সময় শিশুদের নিয়ে সতর্কভাবে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছেন। এ ছাড়া আসন্ন ঈদে অভিভাবকদের প্রতি ভিড় এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গেই ১৬ জন মারা গেছে। ঢাকায় সর্বোচ্চ ১০, ময়মনসিংহে দুই এবং রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল ও সিলেটে একজন করে মারা গেছে। এ সময় নতুন করে এক হাজার ৪৩৪ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১২৮ জনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। আর হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে এক হাজার ৩০৬ জনের শরীরে।
এতে আরও বলা হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত এ নিয়ে সন্দেহজনক হামে ৪৪২ জন ও নিশ্চিত হামে ৮৬ জন মারা গেছে। একই সময়ে সারা দেশে হাম সন্দেহে ৫০ হাজার ৫৫৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ৪৬ হাজার ২১৪ জন ছাড়পত্র পেয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৬৩ হাজার ৮১৩ শিশুর। আর এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৮ হাজার ৬২২ জন।
হামে মৃত্যুতে শীর্ষে বাংলাদেশ: বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ বছর বাংলাদেশ হামে মৃত্যুর শীর্ষে। একই সময়কালে হাম ও উপসর্গে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে সুদানে। সেখানে মারা গেছে ৩৭১ জন। ২০২৬ সালে হাম ও উপসর্গে মৃত্যুতে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে আছে পাকিস্তান। দেশটিতে হামে অন্তত ৭১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বিশ্বের কিছু অঞ্চলে আবার হাম রোগের পুনরুত্থান দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে হামের এ নতুন প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে প্রাণঘাতী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন, মেক্সিকো, অ্যাঙ্গোলা, কাজাখস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান ও ক্যামেরুনসহ বহু দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশে রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। প্রথমদিকে রাজশাহী ও পার্শ্ববর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে শিশুরা আসতে শুরু করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অজ্ঞাত রোগে ৩৩ শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি জানাজানি হলে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় সারা দেশে। তবে সেসময় অনেক শিশুর মৃত্যুর কারণ হাম নয় বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। তবে রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, প্রথমে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। এই জেলায় হামে শিশুর মৃত্যু হয়েছে বেশি।
হাম ও হামের উপসর্গে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এই সময়ের মধ্যে হাম সন্দেহে ১৬৪ এবং নিশ্চিত হামে ৫০ মৃত্যু হয়েছে, অর্থাৎ ২১৪ মৃত্যু হয়েছে এখন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে। এরপরই আছে রাজশাহী বিভাগ, এখন পর্যন্ত হাম সন্দেহে ৭৯ এবং নিশ্চিত হামে ২ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এছাড়া চট্টগ্রামে হাম সন্দেহে ৪২ জন এবং নিশ্চিত হামে ১০ জন, বরিশালে হাম সন্দেহে ৩১ এবং নিশ্চিত হামে ১৯ জন, সিলেটে হাম সন্দেহে ৪৯ এবং নিশ্চিত হামে ৩ জন, ময়মনসিংহে হাম সন্দেহে ৩৫ জন এবং নিশ্চিত হামে দুই জন, খুলনায় হাম সন্দেহে ২১ জন এবং রংপুরে হাম সন্দেহে পাঁচ জন মারা গেছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
হামে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রাপ্তবয়স্করাও: শিশুদের পাশাপাশি হামে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রাপ্তবয়স্করাও। তবে বড়দেরও হাম হতে পারে- এই বিষয়টি এত দিন বেশির ভাগ মানুষের জানা ছিল না। ফলে ক্রমেই এই রোগের বিস্তার ঘটছে। রোগীরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে হামে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি জানতে পারছেন। কিন্তু ততক্ষণে তাদের স্বাস্থ্যের অনেক অবনতি ঘটছে। এর মধ্যেই হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৫২৮ শিশু।
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের ডা. আসিফ হায়দার বলেন, ‘প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ পরিবারের শিশু সদস্যদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া। কোনো শিশু আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে সঠিকভাবে আইসোলেশনে না রাখলে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও দ্রুত এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই মনে করেন হাম শুধু শিশুদের রোগ। তবে এখন আমরা নিয়মিত প্রাপ্তবয়স্ক রোগী পাচ্ছি। তাদের কারও নিউমোনিয়া হচ্ছে, কারও শ্বাসকষ্ট বাড়ছে।’
তিনি জানান, যারা শিশুকালে টিকা নেননি, টিকার পূর্ণ ডোজ সম্পন্ন করেননি, আগে কখনো হামে আক্রান্ত হননি কিংবা যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। ক্যানসার, যক্ষ্মা, দীর্ঘমেয়াদি অসুখ বা স্টেরয়েড সেবনের কারণে যাদের শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, তাদের ঝুঁকি আরও বেশি।’ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ভ্যাকসিন নলেজ প্রজেক্টের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, যখন একটি এলাকার বেশির ভাগ মানুষকে কোনো একটি সংক্রামক রোগের প্রতিষেধক দেওয়া হয় তখন ওই এলাকায় ওই রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে না। কারণ ওই এলাকায় আর সংক্রমিত হওয়ার মতো মানুষই থাকে না।
চিকিৎসা সামগ্রী দিল আইসিআরসি: হামের পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রদান করেছে আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি)। রোববার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের কাছে আইসিআরসি ঢাকা ডেলিগেশনের পক্ষ থেকে হেলথ প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. জলিসা খানম এ চিকিৎসা সামগ্রী হস্তান্তর করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি বাংলাদেশ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুদানে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ১৪টি, এয়ারওয়ে ম্যানেজমেন্ট ডিভাইস ৫৭০টি, ব্যাগ-ভালভ-মাস্ক ১২টি, রিসাসিটেটর এবং ম্যানুয়াল সাকশন ডিভাইস রয়েছে। যা শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা ও অন্যান্য জরুরি রোগী ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা করবে।
ঈদে শিশুদের নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ: ঈদকে সামনে রেখে গণপরিবহনে বাড়তি ভিড়, অবাধ যাতায়াত, বাড়তি জনসমাগম, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া-আসা এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের কারণে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শিশুদের নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়িয়ে চলা এবং উপসর্গ দেখা দিলে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন। একইসাথে ঈদযাত্রায় শিশুদের নিয়ে বাস, লঞ্চে না উঠে সম্ভব হলে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাতায়াতের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও হাম সংক্রমণ এড়াতে ঈদের সময় শিশুদের নিয়ে সতর্কভাবে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাস ও ট্রেনযাত্রা এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আপনাদের অনুরোধ করছি, ঈদের সময় শিশুদের যেন সব জায়গায় নিয়ে না যাওয়া হয়। বিশেষ করে যেসব শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাদের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বা অতিরিক্ত ভিড় রয়েছে, এমন জায়গায় না নেয়াই ভালো।’
তিনি বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের কাছ থেকে সুস্থ শিশুদের দূরে রাখতে হবে। একইভাবে আক্রান্ত রোগীদেরও অন্যদের সাথে মিশতে দেয়া উচিত না। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
অভিভাবকদের ভিড় এড়িয়ে চলার আহ্বান: বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হামের জীবাণু শরীরে প্রবেশের পর উপসর্গ স্পষ্ট হওয়ার আগেই আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ঘটাতে পারেন। তাই ঈদযাত্রা, শপিং মল, বিনোদন কেন্দ্র ও পারিবারিক সমাবেশ সংক্রমণ বৃদ্ধির বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সংক্রমণ রোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা প্রদান। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, জ্বর বা র্যাশ দেখা দিলে জনসমাগম এড়িয়ে চলা, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। বিশেষ করে ঈদ বা বড় উৎসবের সময় সতর্কতা আরো বেশি প্রয়োজন, কারণ এ সময় মানুষের চলাচল ও ভিড় বেড়ে যায়।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে অনেক পরিবার তাদের গ্রামের বাড়ি যাতায়াত করবেন। এ সময় সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই অভিভাবকদের বলব, যেসব শিশু শারীরিকভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে বা কিছুটা অসুস্থ, তাদের নিয়ে এই ঈদে ভ্রমণ না করাই উত্তম। এতে ওই শিশুর নিজের যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে, তেমনি তার সংস্পর্শে আসা সুস্থ শিশুরাও ঝুঁকিতে পড়বে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শরীরে হামের জীবাণু প্রবেশের পর শুরুতে শুধু হালকা জ্বর দেখা দেয়, কিন্তু তখনো তীব্র উপসর্গ প্রকাশ পায় না। এ সময় থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। ফলে অজান্তেই পরিবারের সদস্য ও আশপাশের মানুষ ঝুঁকিতে পড়ে। এ কারণে ঈদযাত্রা ও বড় ধরনের জনসমাগমের ফলে এ সংক্রমণ আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিকিৎসকরা জানান, হাম অতিসংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত আক্রান্তের হাঁচি, কাশি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। হামের ভাইরাস এতটাই সংক্রামক যে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২-১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। সাধারণত র্যাশ ওঠার চার দিন আগে ও পরে আক্রান্ত ব্যক্তি সংক্রমণ ছড়াতে পারে। হামের ভাইরাস বাতাসে বা কোনো কক্ষের পরিবেশে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো ঘরে অবস্থান করার পর সেখানেও অন্যরা সংক্রমিত হতে পারে। বিশেষ করে গণপরিবহন, স্কুল, বাজার, হাসপাতাল, শপিং মল, কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
হামের সংক্রমণের মধ্যে শিশুদের নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়িয়ে চলতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, স্বাভাবিকভাবেই ঈদের সময়ে বড় ধরনের জনসমাগম হয়। বাস, ট্রেন, লঞ্চ এবং বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে মানুষের ভিড় বাড়ে। ঈদের জামাতে শিশুদের মাস্ক পরানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সচেতন না হলে অনেক সংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত হতে পারে।
সমন্বয়হীনতায় কমছে না হামের প্রকোপ: বিশেষজ্ঞরা মনে করেছিলেন, চলতি মাসের শেষ দিকে সংক্রমণের হার কিছুটা কমে আসতে পারে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে সেই লক্ষণ এখনও স্পষ্ট নয়। বরং সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি ও কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিলম্ব হচ্ছে।
তাদের মতে, শুরু থেকেই রোগ নিয়ন্ত্রণে আরও দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতো। টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি এবং দ্রুত শনাক্তকরণ ব্যবস্থার ঘাটতি বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের ব্যাপক চলাচল সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে যাতায়াত ও জনসমাগম বাড়লে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখনই সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজীর আহমেদ। তিনি বলেন, হামে মৃত্যুর হার কমাতে কার্যকর সর্বাত্মক উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়; বরং বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৩টি শিশু মারা যাচ্ছে। বিষয়টিকে যেন স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, আমাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, আমরা যেন হামে মৃত্যু কমাতে চাইছি না। সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে অনেকেই হামের পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আছে বা সংক্রমণ কমে আসছে বলে মন্তব্য করছেন, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
চিকিৎসক ও নার্সদের ছুটি বাতিল: ঈদের ছুটিতেও হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবা চালু রাখতে চিকিৎসক ও নার্সদের ছুটি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। রোববার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক অনুষ্ঠান শেষে তিনি বলেন, হামের রোগী এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কোনো চিকিৎসক বা নার্সের ছুটি হবে না। যেসব হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুরা ভর্তি আছে, সেখানে ঈদের ছুটির মধ্যেও চিকিৎসকরা দায়িত্ব পালন করবেন।
হামের টিকা নেওয়ার পরও শিশু আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ভ্যাকসিন নিলেই নিশ্চিতভাবে হাম হবে না, এমনটি বলা যায় না। ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষেত্রবিশেষে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকতেই পারে। ঈদের সময় আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে ভিড় এড়িয়ে চলা এবং আক্রান্ত শিশুদের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে না নেওয়ারও অনুরোধ করেন তিনি।
সাননিউজ/আরএ
