দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক ধরনের মিশ্র বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। একদিকে রফতানি ও প্রবাসী আয় বাড়ার ধারা অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি, রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে এক বিশ্লেষণ তুলে ধরে বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও সম্ভাবনাময় হলেও টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে রাজস্ব সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রফতানি বাজার সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
সোমবার (৯ মার্চ) রাজধানীতে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা’ শীর্ষক সেমিনারে এই বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র ও বেসরকারি খাতের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
অর্থনীতির সাম্প্রতিক চিত্র
উপস্থাপিত বিশ্লেষণে বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
খাতভিত্তিক অবদানের হিসাবে দেখা যায়, অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে সেবা খাত, যার অংশ প্রায় ৫১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। শিল্প খাতের অবদান ৩৭ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১১ শতাংশ।
এই সময়ে দেশের পণ্য রফতানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে আমদানি হয়েছে প্রায় ৬৭ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার।
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। দেশে মোট কর্মসংস্থানের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ এবং বেকারত্বের হার প্রায় ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে ইতিবাচক এসব সূচকের পাশাপাশি অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি এখনও বড় চাপ
দেশের অর্থনীতির ওপর সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করছে মূল্যস্ফীতি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশে নামলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনও প্রায় ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজারে কারসাজি, সরকারি ঋণনির্ভরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ– এসব কারণ দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতিকে উচ্চ পর্যায়ে ধরে রেখেছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজার তদারকি জোরদার করা, মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি
অর্থনীতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো বেসরকারি বিনিয়োগের নিম্নগতি।
২০২৫ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হার নেমে এসেছে প্রায় ২২ দশমিক ০৩ শতাংশে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
উচ্চ সুদের হার, নীতিগত অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে বিনিয়োগ কমার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এছাড়া মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি এবং নতুন ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রবণতা কমে যাওয়াও শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা
রাজস্ব খাতেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি দেশের কর-জিডিপি অনুপাত কমে প্রায় ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে।
কর ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল অবকাঠামো না থাকায় রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা এখনও সীমিত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে করের আওতা বাড়ানো, ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা চালু করা এবং প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বৈশ্বিক অস্থিরতায় বাণিজ্যে ঝুঁকি
বিশ্ব অর্থনীতিতেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে, যা বাংলাদেশের বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, নতুন বৈশ্বিক শুল্কনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ার কারণে বাংলাদেশের রফতানিতে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
এ পরিস্থিতিতে প্রচলিত বাজারের বাইরে নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এলডিসি উত্তরণ সামনে বড় পরীক্ষা
২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রক্রিয়া অর্থনীতির জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে রফতানি সুবিধা কমে যাওয়া, মেধাস্বত্ব আইন কঠোর হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হলে শক্তিশালী রূপান্তর কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।
জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে চাপ
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ জ্বালানি আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে, যার বড় অংশই প্রাকৃতিক গ্যাস।
দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
অন্যদিকে দেশের লজিস্টিক ব্যয় জিডিপির প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ, যা উন্নত দেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
ব্যবসায়ীরা মনে করেন, পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো গেলে রফতানিতে প্রতিযোগিতা অনেক বাড়বে।
কৃষি ও শিল্পে নতুন বাস্তবতা
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশের কৃষি খাতে এখনও প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ কর্মরত থাকলেও গ্রাম থেকে শহরে শ্রমিক স্থানান্তরের কারণে কৃষিতে শ্রমিক সংকট বাড়ছে।
এছাড়া যান্ত্রিকীকরণের হার তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদনশীলতা বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিল্প খাতের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সামনে করণীয়
ডিসিসিআইয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে কয়েকটি ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এর মধ্যে রয়েছে– বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, কর ব্যবস্থার ডিজিটাল সংস্কার, নতুন রফতানি বাজার তৈরি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়ন।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, সময়োপযোগী নীতি ও কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে বর্তমান চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি আবারও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পথে ফিরে যেতে পারবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন– ড. মঞ্জুর হোসেন, এএইচএম জাহাঙ্গীর এবং ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন।
