মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে কেন্দ্র করে দেশে জ্বালানি নিয়ে চলছে লঙ্কাকাণ্ড। জ্বালানি তেল নিয়ে সরকারের আশ্বাসের পরও সাধারণ মানুষের মাঝে শঙ্কা কাটছে না। সরকারের তরফ থেকে নানাভাবে জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে—অন্তত আগামী দুই মাস বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের কোনও সংকট হবে না। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের সমাধান হয়ে গেলে পুরো পরিস্থিতি বদলে যাবে। তারপরও সাধারণ মানুষ সরকারের বক্তব্যে ভরসা করতে পারছে না। বিশেষ করে পেট্রোল পাম্পের বাইরে যানবাহনের লম্বা লাইন তেমনই আভাস দিচ্ছে। অপরদিকে তেল সংকটের সুযোগে একটি শ্রেণির ব্যবসায়ী তেল মজুত করছে। নাটোরে মাটির নিচে অবৈধভাবে মজুত করা ১০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধারের খবরটি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষ এসব ঘটনা দেখে আরও শঙ্কিত হচ্ছেন।
শনিবার (৭ মার্চ) রাতে ঝিনাইদহ শহরে ফিলিং স্টেশন থেকে মোটরসাইকেলে তেল নিতে আসে এক তরুণ। বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে ওই তরুণকে পিটিয়ে হত্যা করে পাম্পের কর্মচারীরা বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু ঝিনাইদহ নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে ঝগড়াঝাটির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
গত কয়েক দিন ধরেই রাজধানীসহ বড় শহরের সব পেট্রোল পাম্পে একই চিত্র লক্ষ করা গেছে। তেল নেওয়ার জন্য গাড়ির লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। সাধারণ ভোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে এর দুটি কারণ জানা গেছে। প্রথমত, মানুষ সার্বিক পরিস্থিতিতে শঙ্কিত। কেউ কেউ মনে করছেন, আগামী দিনে চাহিদা মতো তেল আর পাওয়া যাবে না— ফলে আগেভাগে মজুত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারিভাবে তেল সরবরাহের যে নিয়ম চালু করা হয়েছে, তাতেও দ্রুত তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে। ফলে ওই ভোক্তাকে আবার তেলের জন্য লাইন ধরতে হচ্ছে। সঙ্গত কারণে তেলের লাইন কখনও খাটো হচ্ছে না।
গ্রাহকের আতঙ্ক
রবিবার (৮ মার্চ) রাজধানীর পরিবাগে শাহেদ নামে একজন বাইক রাইডারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এখন মোটরসাইকেলে ২ লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছে। এই দুই লিটার শেষ হলে আবার আসতে হচ্ছে। আগে ফুল ট্যাংকে তেল নিতেন। শেষ হওয়ার পর আবার পাম্পে আসতেন, এখন আর সেটি হচ্ছে না। এখন তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তবে কেউ কেউ বলছেন, মাঝে মধ্যে পাম্প ফাঁকা থাকলে সরকারি বিধিনিষেধ না মেনে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। রবিবার রাজধানীর বসুন্ধরা শপিং মলের সামনে আল আমিন নামে একজন প্রাইভেটকার চালক জানান, তিনি পাম্পে গিয়ে বলেছেন—তাকে ফুল ট্যাংক তেল দিতে। তাকে কেউ সিলিংয়ের কথা বলেনি। তিনি টাকা দিয়ে চাহিদা মতো তেল নিয়ে এসেছেন। আবার কেউ কেউ বাড়তি তেল কিনে গাড়িতে ভরে রাখছেন। কেউ বা আবার তেল কিনে নিয়ে বোতলে ভরে রেখে আবার আসছেন তেল কিনতে। এ ধরনের ঘটনাও শোনা যাচ্ছে।
জ্বালানি পরিস্থিতি আসলে কী
বাংলাদেশে মোট জ্বালানি তেলের চাহিদা বছরে ৬০ লাখ টন। এর মধ্যে বছরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয় ১৩ থেকে ১৫ লাখ টন। বাকি ৪৫ থেকে ৪৭ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করা হয়। এই দুই ধরনের জ্বালানি তেলের মধ্যে এখন যুদ্ধের কারণে বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালি দিয়ে কেবল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। আর পরিশোধিত জ্বালানি তেল যেসব দেশ থেকে আমদানি করা হয়—তারা কেউই হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রফতানি করে না। এখন পরিস্থিতি যদি একেবারে অনুকূলে না আসে, তাহলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি কমিয়ে দিতে হবে। এক্ষেত্রে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে ১৫ লাখ টন জ্বালানি তেলে পরিশোধন করে। সেক্ষেত্রে প্রতিমাসে এই রিফাইনারির পরিশোধন ক্ষমতা ১ লাখ ২৫ হাজার টন। ফলে এটি তেমন কোনও সংকট তৈরি করার কথা না বলেই সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে দেশে জ্বালানি মজুতের সবশেষ অবস্থা তুলে ধরেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা শেষে জ্বালানিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন—দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। শুধু মার্চ নয়, আগামী এপ্রিল পর্যন্ত দেশের যে চাহিদা, তা পূরণ করার মতো তেলের মজুত রয়েছে। সোমবার আরও দুটি তেলের ট্যাংকার দেশে আসছে। সেই দুটি এলে মজুত আরও বাড়বে। সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
এখন সেচ মৌসুমে ডিজেলের চাহিদা বছরের অন্য সময়ের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে আগামী এপ্রিল মাসের শেষে বা মে মাসের শুরুর দিকে সেচ মৌসুম অনেকটা শেষ হয়ে যাবে। তখন ডিজেলের চাহিদাও কমে আসবে। অপরদিকে বাংলাদেশ পেট্রোল আমদানি করে না। দেশের যে গ্যাস খনিগুলো রয়েছে, সেখানের উপজাত প্রক্রিয়া করে পেট্রোল বানানো হয়। খুব সামান্য পরিমাণ বুস্টার আমদানি করে পেট্রোলের মধ্যে মিশিয়ে অকটেনও দেশে উৎপাদন করা হয়। ফলে পৃথিবীর যে প্রান্তেই সমস্যা হোক না কেন, দেশে পেট্রোল এবং অকটেনের কোনও ঘাটতি হওয়ার কথা না, বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিপিসি জানায়, বর্তমানে বন্দরে একটি জাহাজ থেকে তেল খালাস চলছে। সোমবার আরও দুটি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এছাড়া এপ্রিল পর্যন্ত ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত করা হয়েছে। ফলে জ্বালানি তেল নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই বলে জানিয়েছে বিপিসি।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির (একাংশের) সভাপতি মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আতঙ্কের কারণে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল নিয়েছেন। এতে অনেক পাম্পে তেল শেষ হয়ে গেছে। শুক্রবার ও শনিবার সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় সাধারণত তেলবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে। এ সময় পাম্পে তেল সরবরাহ করা হয় না। এই নিয়ম কিছুটা শিথিল করলেই এই সমস্যা হতো না। আমাদের দরকার চার গাড়ি। পেয়েছি মাত্র এক গাড়ি তেল। ফলে সময়ের অনেক আগেই পাম্পে তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘এই রেশনিংয়ের ভোগান্তি পোহাচ্ছি আমরা। তেল দিতে না পারায় গ্রাহকদের পিটুনিও খেতে হচ্ছে আমাদের। চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করার পাশাপাশি নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা দরকার।’’
