পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের সংকটে গাড়ির সারি এখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকছে। সরবরাহ অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির কারণে সংকট আর বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। তাদের শঙ্কার সতত্য মিলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন অবৈধ তেল মজুত জব্দ হচ্ছে। কালোবাজারে বিক্রির জন্য জরিমানাও করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্বাভাবিক দর বেড়েছে। চলতি মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) অন্তত আড়াই হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়েছে। আমদানির পেছনে সরকার প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে ভর্তুকির চাপ কমাতে বিদ্যুতের দর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। যদিও দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারের তরফে বলা হয়েছিল, দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সাংবাদিকদের জানান দেশে তেলের সংকট নেই, গত বছরের চেয়ে বেশি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে আতঙ্কে মানুষ প্রয়োজনের বেশি তেল কিনছে। সেই সঙ্গে কালোবাজারিও হচ্ছে। অনেকেই তেলের অবৈধ মজুত করছে। কালোবাজারিরা মজুত করে জ্বালানি তেলের সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তেল নিয়ে যারা কারসাজি করছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে আশা করেন মন্ত্রী। যদিও সরকার বলছে সংকট নেই, তবে বাস্তবে জ্বালানি তেল নিয়ে ভোগান্তিতে আছে জনগন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জ্বালানি নিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় পরিবহনকারী লরি থেকে তেল বিক্রির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেই সঙ্গে অবৈধ মজুতেরও প্রমাণ মিলেছে। গতকাল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩০টি ড্রামে মজুত করা আনুমানিক ছয় হাজার লিটার ডিজেল উদ্ধার করেছে জেলা প্রশাসন। জ্বালানি তেল মজুত রেখে গ্রাহকের কাছে বিক্রি না করার অভিযোগে গতকাল দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে মেসার্স ব্রাদার্স অ্যান্ড সিস্টার্স ফিলিং স্টেশনকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ফিলিং স্টেশনটিতে দুই হাজার ৩৬৮ লিটার পেট্রোল, তিন হাজার ৭৬০ লিটার ডিজেল এবং তিন হাজার ৬৫৫ লিটার অকটেন মজুত ছিল।
সরকার জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট রোধে অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এখন থেকে জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুত করার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা হবে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। জ্বালানি তেলের সরবরাহ তদারকি করতে এরই মধ্যে দেশের সব জেলায় ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে। অবৈধ মজুতদারি বন্ধে যারা তথ্য দিয়ে সহায়তা করবেন, তাদের জন্য আনুষ্ঠানিক পুরস্কারের ঘোষণা আসতে যাচ্ছে।
একদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা, অন্যদিকে আমদানি খরচের ঊর্ধ্বগতি। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে ১০ শতাংশ এবং ধাপে ধাপে তা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে দাম বাড়ানোর প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণের জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে। এতে ভর্তুকি কতটা কমবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে কী প্রভাব পড়বে, তা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি খরচ ২৭ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা বড় চাপ তৈরি করছে। গ্যাস সংকট ও এলএনজি আমদানির খরচ বাড়ার ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং খরচ আরও বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
এদিকে আইএমএফের বৈঠক সামনে রেখেও ভর্তুকি কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে সরকার এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। গ্রাহকস্বার্থ ও অর্থনৈতিক চাপ– দুদিক বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও মজুত স্বাভাবিক রাখতে গতকাল ভারত থেকে পাঁচ হাজার টন ডিজেল পাইপলাইন দিয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেল হেড ডিপোতে সরবরাহ করা হয়েছে। আজ শনিবার থেকে আরও সাত হাজার টন ডিজেল ভারতের নুমালীগড় রিফাইনারি লিমিটেড থেকে সরবরাহ শুরু হবে। এ তেল এসে পৌঁছাতে সময় লাগবে তিন দিন। দুটি জাহাজে করে এক লাখ ২৩ হাজার টন এলএনজি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে গতকাল পৌঁছেছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে এইচএল পাফিন জাহাজে ৬১ হাজার ৯৯৭ টন এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে নিউ ব্রেভ জাহাজে ৬১ হাজার টন এলএনজি এসেছে। বন্দর সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। পেট্রোবাংলা জানায়, মার্চে ৯টি কার্গোর মধ্যে এখন পর্যন্ত সাতটি এসেছে। কাতার থেকে দুটি কার্গো এখনও পৌঁছায়নি। আগামী ৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে সেলসিয়াস গ্যালাপাগোস জাহাজে আরও ৭০ হাজার টন এলএনজি আসার কথা রয়েছে।
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। আজ শনিবার থেকেই জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছে সংগঠনটি। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল এ আহ্বান জানান।
সরকার সরবরাহ স্বাভাবিক বললেও রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ সারি কমেনি। ঢাকার বিজয় সরণি, আসাদগেট ও আশপাশের এলাকায় গতকালও লম্বা লাইন দেখা যায়। অনেক পাম্পে নির্দিষ্ট সময় পর তেল সরবরাহ শুরু হলেও সকাল থেকে চালকদের অপেক্ষা করতে হয়েছে। তেল না পেয়ে রাতে সাতক্ষীরা সদরের ছয়ঘরিয়ার একটি পেট্রোল পাম্পের সামনে সড়ক অরোধ করে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছেন চালকরা।
একাধিক পাম্পে ২ থেকে ৫ লিটার করে তেল দেওয়া হয়েছে। মোটরসাইকেল চালক নজরুল ইসলাম জানান, কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
সান নিউজ/আরএ
